বিশেষ প্রতিবেদন

৪৩ শতাংশ স্থানীয় জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত

উখিয়া কলেজের ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী উধাও। সর্বশেষ উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় ৪০৬ জন অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩৫ জন। এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী উখিয়া-টেকনাফের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ উখিয়া কলেজের অধ্যক্ষ মো. ফজলুল করিম বলছিলেন মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের কারণে স্থানীয় শিক্ষাব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আর স্থানীয় বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) সমন্বিত ফোরাম (সিএসও এনজিও ফোরাম) ও কোস্ট ট্রাস্ট নামের একটি এনজিওর গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের কারণে ৪৩ শতাংশ স্থানীয় জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, আইন-শৃঙ্খলাসহ মারাত্মক বিপর্যয় ঘটেছে স্থানীয় অর্থনীতিতে।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ ২৫ আগস্ট। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর গত বছরের এই দিনে বাংলাদেশের সীমান্তে তাদের ঢল নামে। নতুন করে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দাঁড়ায় সাত লাখের বেশি। এর আগেও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা ওই এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে।

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণে স্থানীয় জনজীবনে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে সেটা নিয়ে এই প্রতিবেদক কথা বলেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে। উখিয়া কলেজে অধ্যক্ষ ফজলুল করিম বলছিলেন, শিক্ষায় এমন ক্ষতি একদম প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে স্নাতকোত্তর শ্রেণি পর্যন্ত। ১৯৯১ সালে স্থাপিত উখিয়া কলেজের শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই হাজার ১৫০ জন। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে কর্মরত এনজিওগুলোতে চাকরি করার কারণে ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী কলেজ থেকে একপ্রকার উধাও হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘এই রোহিঙ্গা আমার ঐতিহ্যবাহী কলেজের মানসম্মান ডুবিয়ে দিয়েছে।’

ফজলুল করিম বলেন, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির তদারকির জন্য কলেজ ভবনের অর্ধেকেই নানা কার্যালয় বসানো হয়েছে। কলেজের চার বিষয়ে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) এবং সাত বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) কোর্সের লেখাপড়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

‘পরিকল্পিত উখিয়া চাই’ নামের একটি সংগঠনের আহ্বায়ক নূর মোহাম্মদ সিকদার বলেন, এনজিওতে চাকরি করা এলাকায় মানুষের একটি নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিয়েছে। কেননা কলেজ শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই হুজুগের বশে ঢুকে পড়েছে এনজিওতে। এমন নয় যে তারা আর্থিকভাবে মারাত্মক টানাপড়েনের শিকার হয়ে এনজিওর চাকরি নিয়েছে। বাস্তবে তারা সাময়িক মজা করতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়ছে। অভিভাবকরাও এখন বড় বেকায়দায় পড়ে গেছে। তারা সন্তানদের ঘরে কিংবা শিক্ষাঙ্গনে ফেরাতে পারছে না।

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নুরুল আবছার চৌধুরী জানান, উখিয়া-টেকনাফের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কসংলগ্ন এলাকায়। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণে মহাসড়কটি সাংঘাতিক রকমের ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যেখানে আগে ১৫ মিনিটে একটি যানবাহন চলাচল করত সেখানে বর্তমানে একই সময়ে ১৫টি যান চলাচল করছে। এ কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। তার ওপর সীমান্তের দুই উপজেলায় রয়েছে সাড়ে পাঁচ লাখ বাসিন্দা। এদের সঙ্গে ৩২টি শিবিরে রয়েছে আরো প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। ফলে সার্বিক নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেছে।

৪৩ শতাংশ স্থানীয় জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত: গত ২০ আগস্ট কক্সবাজারে এসংক্রান্ত এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বেসরকারি সংস্থা সিএসও এনজিও ফোরাম ও কোস্ট ট্রাস্ট। প্রতিবেদনে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবং বিরাজমান সংকট সমাধানে বরাদ্দকৃত অর্থের শতভাগ বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন সময় আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। রোহিঙ্গারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এ দেশে অনুপ্রবেশের সময় নষ্ট হয় ফসল-আবাদি জমি ও বসতভিটা পর্যন্ত। প্রাথমিক হিসাবে তাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে উজাড় হয় কক্সবাজারের প্রায় ৬০০ কোটি টাকা সমমূল্যের বনজসম্পদ। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ স্থানীয় অর্থনৈতিক অবকাঠামো।

এই ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে স্থানীয় পর্যায়ে গবেষণা চালায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সিএসও এনজিও ফোরাম ও কোস্ট ট্রাস্ট নামের এনজিওটি।

গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে বহুমাত্রিক ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে শিক্ষা খাতে ২৬.৭ শতাংশ, স্বাস্থ্য খাতে ৩২.৪ শতাংশ, কৃষিতে ৭৮ শতাংশ, পরিবেশে ৬১ শতাংশ, আইন-শৃঙ্খলায় ৪৭ শতাংশ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ৬৩ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ৪৩ শতাংশই ক্ষতির শিকার হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে স্থানীয়দের ওপর রোহিঙ্গাদের প্রভাব সম্পর্কিত এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেন শরণার্থী-ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর), আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থাসহ (আইওএম) বিভিন্ন শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা। কোস্ট ট্রাস্টের পক্ষে প্রতিবেদন তুলে ধরেন সংস্থার সহকারী পরিচালক বরকত উল্লাহ মারুফ।

স্থানীয় জনজীবনে নানামুখী ভোগান্তি : গত বুধবার উদ্যাপিত ঈদুল আজহার আগে কোরবানির জন্য গরু কিনতে গিয়ে উখিয়া-টেকনাফের মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণে কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গেল বছরের বাজারে আড়াই মণ ওজনের একটি গরুর দাম ছিল ৪৫-৫০ হাজার টাকা। আর এবারের ঈদে সেই গরুর দাম উঠেছে ৬০-৭০ হাজার টাকা।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী জানান, এবার সরকারি উদ্যোগে রোহিঙ্গাদের মাঝে ১০ হাজার গরু কোরবানির জন্য বণ্টন করতে গিয়ে স্থানীয় বাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। এমনকি কোরবানির শেষ বাজারে একটি গরুপ্রতি ১০-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বেড়ে গেছে। আবার দাম বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে নিজের গোয়ালঘরটিই শূন্য করে ফেলেছে।

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতিও ঘটেছে। এলাকায় প্রতিদিনই লেগে রয়েছে চুরির ঘটনা। উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বাসিন্দারা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ায় জনজীবনে প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। সামাজিক বৈষম্যের বিষয়টিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, রোহিঙ্গা হলেই কক্সবাজারের সরকারি-বেসরকারি যেকোনো হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা পেয়ে থাকে। কিন্তু স্থানীয় লোকজনকে নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী জনপদের বাসিন্দারা নানাভাবে ভোগান্তিতে রয়েছে এটা ঠিক। বিষয়টি সরকারও অবহিত রয়েছে। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা কক্সবাজারের স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের ঈদ-কোরবানিসহ নানা উপলক্ষে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।’