বিএনপি

২১ আগস্ট মামলার রায়ে বিএনপিতে বড় ধাক্কা

ফাইল ছবি

ইতিহাসের বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিণ্টুর মৃত্যুদণ্ডাদেশ হওয়ায় বিএনপি জুড়ে ‘অস্বস্তি’ বিরাজ করছে। মুখে ‘ফরমায়েশি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রায়’ বললেও দলটির নেতা-কর্মীদের শরীরিক ভাষা ও চেহারা পাঠ করলে অস্বস্তির বিষয়টি পরিস্কার প্রতীয়মান হয়। শুধু বিএনপিই নয়, দলটির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ও নতুন রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যেও রায়ের পর ‘মুখ লুকানো ভাব’ পরিলক্ষিত হচ্ছে। বুধবার রায় ঘোষণার পর গত দু’দিনে বিএনপি, ২০ দল ও বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার অন্তত ২০ জন নেতার সঙ্গে এই প্রতিবেদকের আলাপকালে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তারা নিজেদের এই অস্বস্তির কথা জানান।

বিএনপির নেতারা মনে করছেন,  মামলার রায় দলের জন্য একটি বড় ধাক্কা। রায়ের ফলে ক্ষমতাসীনেরা যতটুকু সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তার কয়েকগুন বেশি অসুবিধায় পড়েছে বিএনপিসহ দলের নতুন-পুরনো মিত্ররা। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সংসদ ভেঙে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একাদশ সংসদ নির্বাচনের দাবিতে তত্পরতা ও বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠনের উদ্যোগের ফলে সামগ্রিক যে পরিস্থিতি চলছিল সেখানে এই রায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।

যদিও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘এই রায়ের ফলে বিএনপি কোনো ধাক্কা খায়নি। জনগণের মাঝেও এর কোনো প্রভাব নেই। কারণ দেশবাসী জানে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশে এবং বিএনপিকে হেয়প্রতিপন্ন করতেই এই ফরমায়েশি রায় দেয়া হয়েছে। জনগণের কাছে এই রায়ের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। বর্তমানে আদালতের ওপর জনগণের কোনো আস্থাও নেই। কেননা বিচারকরা নিরপেক্ষভাবে ও নির্ভয়ে রায় দিতে পারছেন না। বিচারপতি এস কে সিনহাকে যেভাবে সরিয়ে দিয়ে দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে এরপর এসব রায় নিয়ে জনগণের কোনো আগ্রহ নেই।’

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই রায়ের ধাক্কা সামলাতে কিছু অঘোষিত কৌশল নিয়েছে বিএনপি। রায় নিয়ে খুব বেশি প্রতিক্রিয়া কিংবা বক্তব্য-মন্তব্য না করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলটির বর্তমান শীর্ষ নেতারা। রায়ের বিষয়টিকে ততটা গুরুত্ব না দিয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সংসদ ভেঙে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়ের দিকেই মূল মনোযোগ রাখার পক্ষে দলের নীতিনির্ধারকরা। তারা মনে করছেন, কিছুদিন অতিবাহিত হলে রায়কেন্দ্রিক আলোচনা স্বাভাবিক হয়ে আসবে। এরপর আবারও খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি এবং বৃহত্তর ঐক্য গঠনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসা হবে। এর আগে এখন বৃহত্তর ঐক্য গঠন করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হলে সেগুলো ওইভাবে গ্রহণযোগ্যতা নাও পেতে পারে।

এই চিন্তা-ভাবনা থেকেই রায়ের প্রতিবাদে পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগরসহ সারাদেশে জেলা-থানায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করার কথা থাকলেও বিএনপি নেতা-কর্মীরা ঢাকাসহ বাইরে কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ  করেছে। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীর নেতৃত্বে সকালে পুরান ঢাকায় মহানগর দায়রা জজ আদালত মোড় থেকে একটি মিছিল বের করা হয়। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, রায়ের প্রতিবাদে আগামীকাল শনিবার ছাত্রদল, ১৪ অক্টোবর যু্বদল ও ১৫ অক্টোবর স্বেচ্ছাসেবক দলের বিক্ষোভ সমাবেশ, ১৬ অক্টোবর ঢাকা মহানগরীসহ সারাদেশে জেলা-মহানগরে কালো পতাকা মিছিল, ১৭ অক্টোবর মহিলা দল এবং ১৮ অক্টোবর শ্রমিক দলের যে মানববন্ধন কর্মসূচি রয়েছে সেখানেও বৃহত্ কোনো জমায়েত নার করার চিন্তা রয়েছে।

একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় নিয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিকল্পধারা সভাপতি ও যুক্তফ্রন্ট চেয়ারম্যান অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ‘এই রায় চূড়ান্ত নয়। এটা রায়ের প্রথম ধাপ। এরপর আইনি প্রক্রিয়ার আরও ধাপ অবশিষ্ট আছে। চূড়ান্ত রায়ের পর সবকিছু পরিস্কার হবে।’

রায় পরবর্তী উদ্ভুত পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার শীর্ষ নেতাদের গতকালের বৈঠক স্থগিত করা হয়। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বেইলি রোডের বাড়িতে এই বৈঠকটি হওয়ার কথা ছিল। স্থগিত হওয়া বৈঠকে অধ্যাপক বি. চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনেরও থাকার কথা ছিল। গত ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চে বৃহত্তর ঐক্যের নেতারা একমঞ্চে ওঠার পর এটিই হওয়ার কথা ছিল শীর্ষ নেতাদের পরবর্তী বৈঠক। তবে একটি সূত্রের দাবি, অধ্যাপক বি. চৌধুরী ড. কামালের বাসায় যেতে সম্মত না হবার কারণে গতকালের বৈঠকটি হয়নি।

বিএনপির ও বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যেহেতু বর্তমানে রায়ের একটা প্রভাব জনমনে রয়েছে সে কারণে এখন এই ধরনের বৈঠক করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হলে তা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাছাড়া রায়ের প্রতিবাদে যেহেতু আগামী ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিএনপির দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে সেগুলো শেষ হবার পর ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা বসে প্রয়োজনীয় করণীয় ঠিক করবেন। বিএনপি চাচ্ছে ১৮ অক্টোবরের পর ঐক্য প্রক্রিয়ার শীর্ষ নেতারা বৈঠকে বসে খালেদা জিয়াসহ সকল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর মুক্তি ও তফসিলের আগে সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের রূপরেখা ঠিক করবেন। তবে এতে আপত্তি জানিয়েছে বৃহত্তর ঐক্যের অন্যতম অংশীদার যুক্তফ্রন্ট। যুক্তফ্রন্ট প্রধান অধ্যাপক বি. চৌধুরী ও তার পুত্র মাহী বি. চৌধুরীসহ ফ্রন্টনেতারা চান ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আলোচনায় যাবার আগে আগামীতে রাজনীতিতে ও সরকার গঠনে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে নির্বাচনে আসন বণ্টনের ফয়সালা।

ড. কামালের বাসায় শীর্ষ নেতাদের বৈঠক স্থগিত হলেও গতকাল রাত নয়টায় যুক্তফ্রন্ট নেতা ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রবের উত্তরার বাসায় অন্যদের বসার কথা ছিল। এই বৈঠকে আ স ম রব ছাড়াও বিএনপির পক্ষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মণ্টু ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব ড. আ ব ম মোস্তাফা আমীনের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তবে গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে ঐক্য প্রক্রিয়ার অন্যতম উদ্যোক্তা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হানা দেয়ায় রবের বাসায় বৈঠকটিও আর হয়নি। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব ড. আ ব ম মোস্তাফা আমীন ইত্তেফাককে জানান, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ওখানে ঝামেলা হবার কারণে রবের বাসায় বৈঠক স্থগিত করা হয়। জানা গেছে, রবের বাসায় আজ বৈঠক হবার সম্ভাবনা রয়েছে।