সারাদেশ

হিসাবছাড়া বাণিজ্য চামড়া নিয়ে

গরু জবাই নিষিদ্ধের ফলে কাঁচা চামড়ার অভাবে ধ্বংস হতে বসেছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ট্যানারি শিল্প। অন্যদিকে সারা বছরের জোগানের অর্ধেক চামড়া এই কোরবানির ঈদে পাওয়া গেলেও সেই চামড়া রীতিমতো ফেলনায় পরিণত হয়েছে বাংলাদেশে। পানির দামে চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে দেশের ব্যবসায়ীদের কাছে।

আবার বিশ্ববাজারে চামড়ার দাম কমের দোহাই দিয়ে দেশে চামড়ার এই দরপতনের দায়ও এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করছেন ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধের ফলে সেখানকার চামড়া কারখানাগুলোর উৎপাদন ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। দেশটির কাছে ট্যানারি শিল্পের প্রধান কাঁচামাল চামড়া এখন ‘সোনার চেয়েও দামি’। কেননা তাদের সরকারের চামড়া খাত থেকে দুই হাজার ৭০০ কোটি ডলার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে রাজস্বের এই লক্ষ্যমাত্রা ২০২০ সাল নাগাদ দ্বিগুণ করারও প্রত্যাশা রয়েছে দেশটির। তা ছাড়া জারা ও ক্লার্কসের মতো বিদেশি নামিদামি ক্রেতাদেরও হারাতে হচ্ছে দেশটিকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডের চামড়াজাত পণ্যের প্রধান উৎস দেশ হতে পারে বাংলাদেশ। তা ছাড়া চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে চীনের বাজার হারানোর আশঙ্কাকে বাংলাদেশ সম্ভাবনা হিসেবেও দেখতে পারে। আর এই সম্ভাবনার সময়ে দেশে নামমাত্র মূল্যে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ দেশবাসীকে হতাশ করেছে বলে মনে করছেন তাঁরা।

এবার ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ হওয়ায় দেশের খামারিরা পর্যাপ্ত গবাদি পশুর জোগান রাখতে পারলেও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় অনেক বিক্রেতাই মন খারাপ করে বাড়ি ফিরেছে। এ ক্ষেত্রে পশুর দামের ক্ষেত্রে যেমন খামারিকে বাঁচানোর কোনো উদ্যোগ নেই, তেমনি কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণেও চামড়া ব্যবসায়ীদের স্বার্থই গুরুত্ব  পেয়েছে। এতিমদের উদ্দেশে দান করা কোরবানির চামড়ার দাম গত চার বছরে ৯০ টাকা প্রতি বর্গফুট থেকে কমিয়ে ৫০ টাকায় আনা হয়েছে।

একটি শিল্পের প্রধান কাঁচামাল এত সস্তায় পাওয়া গেলেও দেশে চামড়াজাত পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। নামিদামি দেশি ব্র্যান্ডের এক জোড়া জুতার দাম এক হাজার ৫০০ টাকার নিচে নেই, একটি বেল্ট ৮০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। একটি মানিব্যাগ ৭০০ টাকা থেকে শুরু করে দুই হাজার টাকার বেশিও আছে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি মাঝারি আকারের গরু থেকে ২২ থেকে ২৫ বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। রাজধানীর বংশালে প্রক্রিয়াজাত চামড়ার বড় বাজার। সেখানে বিভিন্ন আকারের চামড়ার ওপর দামের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। তবে গড়ে প্রতি বর্গফুট ২০০ টাকা করে ধরলে একটি গরুর চামড়ার দাম পড়ে পাঁচ হাজার টাকা। তবে কাঁচা চামড়া থেকে এই চামড়া বের করার পরও আস্তরসহ দুই ধরনের পণ্য বের করা হয় ট্যানারিগুলোতে। সেই হিসেবে একটি কাঁচা চামড়া থেকে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকার বেশি পণ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন পুরান ঢাকার এক চামড়াজাত পণ্য প্রস্ততকারক মোহাম্মদ ইয়াসিন। তিনি জানান, এক জোড়া জুতা তৈরি করতে বড়জোর আড়াই থেকে তিন বর্গফুট চামড়ার প্রয়োজন হয়। তবে এটা নির্ভর করে জুতার নকশা ও আকারের ওপর।

২০১৬ সালে বিশ্বের চামড়াজাত পণ্যের বাজার ছিল ৯৩ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি, যা ২০২২ সাল নাগাদ ১২২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে বৈশ্বিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থাগুলো। এ খাতে অব্যাহত সমৃদ্ধির নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন, ভারতসহ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলো। বাংলাদেশেরও রয়েছে অপার সম্ভাবনা, কারণ দেশটির রয়েছে কাঁচামালের টেকসই ভাণ্ডার। এখন প্রয়োজন এ সম্পদকে কাজে লাগানোর সামর্থ্য।

বাংলাদেশে ট্যানারি শিল্প উৎকৃষ্ট কাঁচামালে সমৃদ্ধ। এখানে চামড়াজাত পণ্যে ১০০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে। ২০২১ সালে চামড়া খাতের রপ্তানি আয়ের ৫০০ কোটি ডলার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ডিজাইন ও ফ্যাশন উদ্ভাবনে নজর দিতে হবে। সক্ষমতাও বাড়াতে হবে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করায়। ঈদের আগ পর্যন্ত দেশে ১৫৫ ট্যানারির মধ্যে ১২০টি পুরোপুরি চালু ছিল। বাকি ৩৫টি ট্যানারির কাজ কোরবানি ঈদের আগেই শেষ হওয়ার কথা। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন-বিটিএর তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ৩০ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদিত হচ্ছে। এর অর্ধেকই আসছে কোরবানির ঈদে।

গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিটিএ সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, গত বছর লবণের দাম বেড়ে যাওয়ায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ চামড়া নষ্ট হয়েছে। প্রতি বর্গফুট চামড়ায় লবণ দেওয়ায় খরচ হয় ১০৫ টাকা আর শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন খরচসহ অন্যান্য বাবদ মোট ২০০ টাকার মতো খরচ হয়।

তিনি আরো বলেন, ‘গত বছর যেসব কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল তারা এখনো উৎপাদনে যেতে পারেনি। আর ওই সময় আস্থা সংকটের কারণে দীর্ঘদিনের বায়ার (ক্রেতা) চলে গেছে। কমপ্লায়েন্সের ইস্যুতে আমরা সেসব বায়ারকে আনতে পারছি না। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে ১ থেকে ১.৭৫ শতাংশ দাম কমেছে। এতে আমরা ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে পারছি না। চীন প্রচুর রপ্তানি আদেশ বাতিল করেছে। গত বছরের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ চামড়া মজুদ আছে। এ বছরও বিক্রির কোনো নিশ্চয়তা নেই।’

এদিকে এবার কোরবানির সময় চামড়ার দরপতনের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে কাঁচা চামড়ার প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়া যায়নি। কোরবানির সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ট্যানারি মালিকসহ কিছু চামড়া ব্যবসায়ীকে নিয়ে আলোচনা করে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে—এই প্রক্রিয়া ঠিক নয়। এই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা দরকার। এই আলোচনায় অনেক বেশি স্বচ্ছতা আনতে হবে। দেশে কী পরিমাণ চামড়ার চাহিদা রয়েছে, গত বছরের চামড়ার মজুদ কেমন আছে, কোন কোন ট্যানারির চামড়ার দরকার আছে এবং কোন কোন ট্যানারি আগের বছরের ঋণ পরিশোধ করেনি—এমন অনেক বিষয় সামনে নিয়ে চামড়ার দাম নির্ধারণ করলে সেটা বাস্তবসম্মত হতো। তা ছাড়া চামড়ার উপযুক্ত একটি দাম থাকা দরকার। সারা বছর চামড়ার যে ধরনের দাম থাকে কোরবানির সময়ও সেই রকম দাম অবশ্যই থাকতে হবে। নইলে যারা এই চামড়ার অর্থের দাবিদার সেই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কাঁচা চামড়া এত সস্তা হওয়ার পরও চামড়াজাত পণ্যের দাম বেশি থাকার একমাত্র কারণ হিসেবে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরকে দায়ী করছেন চামড়ার জুতা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বে গ্রুপের চেয়ারম্যান শামসুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সাভারের চামড়া শিল্পাঞ্চলে ইটিপি না থাকার কারণে আমাদের দেশের চামড়া দিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক মানের কোনো পণ্য প্রস্তুত করতে পারছি না। ফলে রপ্তানি করতে গিয়ে আমাদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে। তা ছাড়া সামগ্রিকভাবে আমাদের কারখানা পরিচালনার ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনে যেতে না পারায় পণ্যের দাম বেশি পড়ছে।’

এদিকে চামড়াজাত পণ্যের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনে যেতে না পারায় ব্যাংকঋণও খুব একটা কাজে আসছে না বলে জানান এই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘এ বছর আমাদের বে ট্যানারির নামে অগ্রণী ব্যাংক ৪০ কোটি টাকা ঋণ মঞ্জুর করলেও এর থেকে আমরা একটি টাকাও ঋণ নিইনি। কেননা এই চামড়া কিনে আমরা কী করব। কার্যকর ইটিপি না থাকায় কমপ্লায়েন্স সনদ মিলছে না। চামড়া কিনে আমাদের কোনো কাজেই আসবে না।’

এবার ঈদের আগে কাঁচা চামড়া কেনার উদ্দেশ্যে ৪২টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৬০১ কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুর করে জনতা, রূপালী, অগ্রণী ও সোনালী ব্যাংক। গত বছর ৪০টি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছিল ৫২৬ কোটি টাকা ঋণ। সেই হিসেবে এবার ৭৫ কোটি টাকা বেশি ঋণ দেওয়া হচ্ছে কাঁচা চামড়া কিনতে।