ধর্ম

হজের ঘোষক ইবরাহিম (আ.)

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে হজ পঞ্চম স্তম্ভ। প্রত্যেক সামর্থ্যবান নর-নারীর ওপর হজ ফরজ। হজের সব বিধান আল্লাহর ঘরকেন্দ্রিক। আল্লাহর ঘর তথা কাবা শরিফ পৃথিবীর প্রথম ঘর। যেমন—আল্লাহর বাণী : ‘নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে, তা হলো এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত এবং সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্য হেদায়েত ও বরকতময়।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৩৬)

কাবাঘর নির্মাণ ও সংস্কার  : মহানবী (সা.) বলেন, আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) পৃথিবীতে আগমনের পর আল্লাহ তাআলা জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে তাঁদের কাবাগৃহ নির্মাণের আদেশ দেন। এ গৃহ নির্মিত হয়ে গেলে তাঁদের তা তাওয়াফ করার আদেশ দেওয়া হয় এবং বলা হয়, আপনি সর্বপ্রথম মানব এবং এ গৃহ সর্বপ্রথম গৃহ, যা মানবমণ্ডলীর জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে। (ইবনে কাসির, বায়হাকি) কোনো কোনো বর্ণনা মতে, আদম (আ.) ও আসমান-জমিন সৃষ্টির দুই হাজার বছর আগে ফেরেশতা কর্তৃক কাবাঘর নির্মিত হয়। কেউ কেউ বলেন, আসমান-জমিন সৃষ্টির ৪০ বছর আগে ফেরেশতা কর্তৃক পৃথিবীর মাঝখানে কাবাঘর নির্মিত হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আদম (আ.) ও তাঁর বংশধররা পুনর্নির্মাণ করেন, তৃতীয় পর্যায়ে ইবরাহিম (আ.) পুনর্নির্মাণ করেন, চতুর্থ পর্যায়ে আমালেকা গোত্র এর সংস্কার করে, পঞ্চম পর্যায়ে জোরহাম গোত্র, ষষ্ঠ পর্যায়ে কুসাই ইবনে কিলাব গোত্র, সপ্তম পর্যায়ে কোরাইশ গোত্র, অষ্টম পর্যায়ে আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর, নবম পর্যায়ে খলিফা আবদুল মালিকের নির্দেশক্রমে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ ও দশম পর্যায়ে ১৪০ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কের বাদশাহ মুরাদ খান এটা নির্মাণ করেন। এর পর থেকে আসল ভিত্তি অদ্যাবধি সেভাবেই বহাল রেখে মাঝেমধ্যে কিছু সংস্কার হচ্ছে।

ইবরাহিম (আ.)-এর প্রতি নির্দেশ : ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) কর্তৃক কাবাঘর পুনর্নির্মিত হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম (আ.)-কে তিনটি নির্দেশ দেন। যেমন আল্লাহর বাণী : ‘যখন আমি ইবরাহিমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম যে আমার সঙ্গে কাউকে শরিক কোরো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখো তাওয়াফকারী, নামাজ আদায়কারী ও রুকু-সিজদাকারীদের জন্য এবং মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দিন। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সব ধরনের কৃশকায় উটের পিঠে সাওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে।’ (সুরা হজ : ২৭-২৮)

হজের ঘোষক ইবরাহিম (আ.) : নবী-রাসুলদের মধ্যে ইবরাহিম (আ.) অন্যতম। তাঁকে বলা হয় আবুল আম্বিয়া তথা নবীদের আদি পিতা। সাতজন নবী ছাড়া সব নবী-রাসুল তাঁর বংশ থেকে এসেছেন। তিনি মুসলমানদের জাতির পিতা। মুসলিম নামটি তিনি প্রথম রাখেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রশংসায় বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই ইবরাহিম ছিলেন সব গুণের সমাবেশকারী, সব কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে এক আল্লাহর অনুগত এবং তিনি মুশরিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন তাঁর অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী। আল্লাহ তাঁকে মনোনীত করেছিলেন এবং পরিচালিত করেছিলেন সরল পথে।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২০-১২১)

ইমাম বগভি বলেন, কাবাঘর নির্মাণ করার পর আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)-কে নির্দেশ দেন যে মানুষের মধ্যে ঘোষণা করে দাও যে বায়তুল্লাহর হজ তোমাদের ওপর ফরজ করা হয়েছে। ইবনে আবি হাতেম ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, যখন ইবরাহিম (আ.)-কে হজ ফরজ হওয়ার কথা ঘোষণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন তিনি আল্লাহর কাছে আরজ করেন, এখানে তো জনমানবশূন্য মরুপ্রান্তর। ঘোষণা শোনার মতো কেউ নেই, যেখানে জনবসতি আছে, সেখানে আমার আওয়াজ কিভাবে পৌঁছবে? আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমার দায়িত্ব শুধু ঘোষণা করা। মানুষের কানে পৌঁছানোর দায়িত্ব আমার। অতঃপর ইবরাহিম (আ.) আবু কুবাইস পাহাড়ে আরোহণ করে দুই কানে অঙ্গুলি রেখে ডানে-বাঁয়ে এবং পূর্ব-পশ্চিমে মুখ করে চিৎকার করে ঘোষণা করেন, ‘হে মানুষেরা! আল্লাহ তোমাদের এ ঘরের হজ করার নির্দেশ করেছেন, যাতে তোমাদের জান্নাত দিতে পারেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিতে পারেন। সুতরাং তোমরা হজ করো।’ ইবরাহিম (আ.)-এর এ আওয়াজ আল্লাহ তাআলা সব মানুষের কানে কানে পৌঁছে দেন। এমনকি যারা ভবিষ্যতে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে আসবে, তাদের কানে পর্যন্ত এ আওয়াজ পৌঁছে দেওয়া হয়। যাদের ভাগ্যে আল্লাহ তাআলা হজ লিখে দিয়েছেন, তাদের প্রত্যেকেই এ আওয়াজের জবাবে আমি হাজির, আমি হাজির বলে হাজির হওয়ার স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ইবরাহিম (আ.)-এর ঘোষণার উত্তরই হচ্ছে হজে লাব্বাইক বলার আসল ভিত্তি। (কুরতুবি, ১২তম খণ্ড, ২৮ পৃষ্ঠা, মাজহারি) ইবরাহিম (আ.)-এর ঘোষণাকে সব মানবমণ্ডলী পর্যন্ত পৌঁছানোর কারণে কিয়ামত পর্যন্ত হজের ধারা কায়েম থাকবে।

হজ ফরজ হওয়ার শর্ত : হজ আর্থিক ও দৈহিক ইবাদত। ফলে হজের জন্য আর্থিক ও দৈহিক উভয় দিক দিয়ে সামর্থ্যবান হওয়া আবশ্যক। হজ ফরজ হওয়ার শর্ত সাতটি—১. মুসলিম হওয়া। ২. জ্ঞানবান হওয়া। ৩. সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হওয়া। ৪. প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। ৫. আজাদ হওয়া। ৬. আর্থিক ও দৈহিকভাবে সামর্থ্যবান হওয়া। ৭. হজের সময় হওয়া।

হজের ফজিলত : পবিত্র কোরআন ও হাদিসে হজের নানাবিধ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। যেমন—

উত্তম ইবাদত : আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, কোন কাজটি সর্বোত্তম? তিনি বলেন : আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান। তারপর জিজ্ঞেস করা হলো : এরপর? তিনি বলেন—আল্লাহর পথে জিহাদ। আবার জিজ্ঞেস করা হলো : তারপর? তিনি বলেন : কবুল হওয়ার যোগ্য হজ। কবুল হওয়ার যোগ্য হজ (হজে মাবরুর) হচ্ছে, যে হজের সঙ্গে কোনো পাপ মিশ্রিত হয় না। হাসান বলেছেন : হজে মাবরুর হচ্ছে সেই হজ, যা থেকে ফিরে আসার পর মানুষ দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত এবং আখিরাতের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।

একটি বর্ণনায় এসেছে যে হজে মাবরুর হচ্ছে, যে হজে মানুষকে খাদ্য খাওয়ানো হয় এবং বিনম্র ভাষায় কথা বলা হয়।

হজ জিহাদতুল্য : হজকে জিহাদের সমতুল্য আখ্যায়িত করা হয়েছে। যেমন—হাসান বিন আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এলো। সে বলল, আমি ভীরু ও দুর্বল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এমন জিহাদে চলে এসো, যাতে কোনো অস্ত্রের তীক্ষতা নেই। তা হলো হজ। (তাবরানি)

নারীদের জিহাদ হলো হজ : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দুর্বল, বৃদ্ধ ও মহিলাদের উপযোগী জিহাদ হচ্ছে হজ। (নাসায়ি)

আয়েশা (রা.) বলেন, হে রাসুলুল্লাহ (সা.)! আপনি তো জিহাদকে সর্বোত্তম আমল মনে করেন। তাহলে আমরা মহিলারা জিহাদ করি না কেন? তিনি বলেন, তোমাদের জন্য শ্রেষ্ঠ জিহাদ হলো হজে মাবরুর। (বুখারি ও  মুসলিম)

আয়েশা (রা.) বলেন, হে রাসুলুল্লাহ (সা.)! আমরা কি আপনাদের সঙ্গে জিহাদ ও লড়াই করতে পারি না? তিনি বলেন, তোমাদের জন্য শ্রেষ্ঠ ও সুন্দরতম জিহাদ হলো হজে মাবরুর। আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে এ কথা শোনার পর আমি আর হজ বাদ দিইনি। (বুখারি ও মুসলিম)

হজ গুনাহ মুছে দেয় : আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজ করল, কোনো অশ্লীল কাজ বা গুনাহর কাজ করল না, সে যখন বাড়িতে ফিরবে তখন সদ্যঃপ্রসূত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে বাড়িতে ফিরবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)

আমর ইবনুল আস বলেন, যখন আল্লাহ আমার অন্তরে ইসলাম ঢোকালেন, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপস্থিত হলাম। তাঁকে বললাম, আপনার হাত এগিয়ে দিন, আমি আপনার কাছে বাইয়াত হব। তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু আমি হাত গুটিয়ে নিলাম। তিনি বলেন, তোমার কী হলো আমর? আমি বললাম, আমার অতীতের গুনাহ মাফ করা হোক। তিনি বলেন, তুমি কী জানো না ইসলাম তার আগেকার সব কিছু মুছে দেয়? হিজরতও তার আগেকার সব কিছু মুছে দেয়। হজও তার আগের সব কিছু মুছে দেয়। (মুসলিম)

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা হজ ও ওমরাহ একাদিক্রমে করো। এই দুটি সব গুনাহ মাফ করে দেয়, যেমন কামারের হাপর লোহা, স্বর্ণ ও রুপার মরিচা দূর করে দেয়। হজে মাবরুরের বিনিময় জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।’ (নাসায়ি ও তিরমিজি)

হাজিরা আল্লাহর মেহমান : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হাজিরা ও ওমরাহকারীরা আল্লাহর প্রতিনিধি ও মেহমান। তারা কোনো দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন, আর মাফ চাইলে মাফ করে দেন। (ইবনে মাজাহ ও ইবনে খুজায়মা)

হজের সওয়াব জান্নাত : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক ওমরাহ অন্য ওমরাহ পর্যন্ত মধ্যবর্তী সব গুনাহর কাফফারা হয়ে যায়। আর হজে মাবরুরের বিনিময় জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। (বুখারি ও মুসলিম)

জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এই ঘর কাবা ইসলামের খুঁটি। যে ব্যক্তি এই ঘরের উদ্দেশে হজ বা ওমরাহ করতে বের হবে, সে আল্লাহর বিশেষ নিরাপত্তায় থাকবে। আল্লাহ যদি তাকে এই অবস্থায় মৃত্যু দেন, তাহলে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর যদি তাকে বাড়িতে ফেরত পাঠান, তাহলে প্রচুর সওয়াব, গণিমতসহ ফেরত পাঠাবেন।

হজ না করার ফল : সামর্থ্য থাকার পরও যে ব্যক্তি হজ করেনি, সে একটি ফরজকাজ বর্জন করল। এর ফলে সে মহাপাপী হবে। মহানবী (সা.) বলেন, অনিবার্য প্রয়োজন অথবা অত্যাচারী শাসক কিংবা কঠিন রোগ যদি কাউকে হজ পালনে বিরত না রাখে, আর সে হজ পালন না করে মারা যায়, তবে যেন ইহুদি-নাসারার মতোই তার মৃত্যু হলো। (দারেমি, মিশকাত ২২২)