খেলাধুলা

স্বপ্ন আছে আর্চারিতে

এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত ইভেন্টে শুধু একটিই রুপা জিতেছে বাংলাদেশ। এবার সেই খরা কাটাতে ১৪ ইভেন্টে জাকার্তা যাচ্ছেন ১১৭ অ্যাথলেট। কঠিন হলেও শ্যুটিং, কাবাডি আর আর্চারিতে পদক জেতার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনও। সেই সম্ভাবনা নিয়ে এ ধারাবাহিক। আজ থাকছে আর্চারি। 

আর্চারির নিয়মটা একটু কঠিন। শুধু সোনা, রুপা বা ব্রোঞ্জ জিতলে অর্থাৎ পদক পেলেই মিলবে সরাসরি টোকিও অলিম্পিকে খেলার সুযোগ। ইতিহাস বলছে ব্যক্তিগত ইভেন্টে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পদক একটাই, সেটা বক্সিংয়ে।

‘জার্মানিতে আমার জন্ম; কিন্তু এখন বাংলাদেশই আমার দেশ। এ দেশের পতাকা নিচে দেখতে চাই না। পতাকাটা এশিয়ান গেমসে যেন জ্বলজ্বল করে, সেই চেষ্টাই করতে বলেছি আর্চারদের’—দৃঢ় কণ্ঠে এই বলে আর্চারদের উদ্দীপ্ত করেন বাংলাদেশের আর্চার কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখ। দেড় বছর আগে দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে আর্চারদের আত্মবিশ্বাস নিয়ে গেছেন আকাশে। সেটা এখনো পদক জেতার মতো নয়। এর পরও মর্যাদার এশিয়ান গেমসে কোয়ার্টার বা সেমিফাইনালে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছেন কেউ কেউ। চমকে দিয়ে অন্তত ব্রোঞ্জ জিতলেও মিলবে সরাসরি অলিম্পিক খেলার সুযোগ।

এমনিতে অলিম্পিক মানে ‘ওয়াইল্ড কার্ড’ নিয়ে খেলা বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের। প্রথম বাংলাদেশি খেলোয়াড় হিসেবে সরাসরি অলিম্পিক খেলার কীর্তি

শুধু সিদ্দিকুর রহমানের। রিও অলিম্পিকে সরাসরি খেলতে র‍্যাংকিংয়ে ৬০ নম্বরে থাকলেই চলত। যোগ্যতা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সিদ্দিকুর ছিলেন ৫৬ নম্বরে। আর্চারির নিয়মটা একটু কঠিন। শুধু সোনা, রুপা বা ব্রোঞ্জ জিতলে অর্থাৎ পদক পেলেই মিলবে সরাসরি টোকিও অলিম্পিকে খেলার সুযোগ। ইতিহাস বলছে ব্যক্তিগত ইভেন্টে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের পদক একটাই, সেটা বক্সিংয়ে। তাহলে এবার কি সম্ভব আর্চারিতে পদক জেতা? সহকারী কোচ জিয়াউল হক আশাবাদী হলেও পদকের নিশ্চয়তা দিচ্ছেন না, ‘আমাদের জার্মান কোচ সবার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছেন। নানা কৌশল শিখিয়েছেন তিনি, যা কাজে লাগাচ্ছে খেলোয়াড়রা। ভুলে যাবেন না, আর্চারিতে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলে কোয়ার্টার ফাইনালে গিয়েছি আমরা। ক্রিকেট বা ফুটবল বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল খেললে মাতামাতি হতো দেশজুড়ে। অথচ আমাদের সাফল্য মানুষ জানেই না সেভাবে। অলিম্পিকে সরাসরি খেলার সুযোগ আছে বলেই পদকের লক্ষ্যে নিজেদের উজাড় করে খেলবে সবাই। বাকিটা ভাগ্যের ওপর।’

জিয়াউল হক আশাবাদী হলেও বাস্তবতাটা ভালোই জানা প্রধান কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখের। বাংলাদেশে অনুশীলন করছে টঙ্গী শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়ামে। সেখানে বাতাসের বেগ নেই সেভাবে। কিন্তু জার্মানিতে হওয়া বিশ্বকাপে প্রবল বাতাস বেশ ভুগিয়েছে বাংলাদেশ আর্চারদের। জাকার্তায়ও বাতাস থাকবে। তা ছাড়া বাংলাদেশ আর্চারিতে সম্প্রতি সাফল্য পেয়েছে ইসলামিক সলিডারিটি ও সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে। এ দুটো টুর্নামেন্টে পদক তালিকার শীর্ষে থাকায় আত্মবিশ্বাস বাড়বে নিঃসন্দেহে। সলিডারিটি গেমসে প্রথমবার ছয়টি আর এবার পাঁচটি সোনা নিয়ে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে এবার পেয়েছে ছয়টি সোনা। কিন্তু এশিয়ান গেমসের মান যে অনেক উঁচুতে, সেটা ভালোই জানা ফ্রেডরিখের। তাই তাঁর লক্ষ্যটা এ রকম, ‘কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে পারাটা বড় সাফল্য হবে। আমি চাই সবাই নিজেদের স্কোর বাড়াক। এশিয়ান গেমসের মতো টুর্নামেন্টে অনেক চাপ থাকে, আমি অনুশীলনে সে রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছি। প্রতিটি তীর মারার জন্য সময় বেঁধে দিচ্ছি। বাড়তি সময় দিচ্ছি না কাউকে। এটা ভালো করতে সাহায্য করবে ওদের।’

আর্চারিতে ভাগ্যও বড় একটা ব্যাপার। কেননা প্রথমে নির্ধারিত হয় র‍্যাংকিং। এরপর হেড টু হেড। আসল খেলা হেড টু হেডেই। এমনও দেখা যায়, র‍্যাংকিংয়ে ৩০ নম্বরে থাকা আর্চার হারিয়ে দিচ্ছেন দুই বা তিনে থাকা খেলোয়াড়কে। নির্দিষ্ট সময়ে তীর-ধনুকের কয়েকটা ভালো নিশানা বদলে দিতে পারে পুরো ছবি। এ জন্যই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা অসীম কুমার দাস এশিয়ান গেমসে নিজের পারফরম্যান্স ছেড়ে দিচ্ছেন ভাগ্যের হাতে, ‘বিশ্বকাপ অনেক আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে আমার। এশিয়ান গেমসেও কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে পারা সাফল্যের হবে। ব্যাপারটা সহজ নয়। হেড টু হেডে খারাপ করলে বিদায় নিতে হবে দ্রুত। আবার ভালো করলে আপনি চলে যাবেন বহুদূর। আমি নিজের সেরাটা চেষ্টা করব, বাকিটা ভাগ্যের হাতে।’

বাংলাদেশ আর্চারির সবচেয়ে বড় তারকা এখন রোমান সানা। ২৩ বছর বয়সী খুলনার এই আর্চার তিন বছরের বৃত্তি পেয়েছেন সুইজারল্যান্ডের। সেখানে থেকে পরিণত হয়েছেন আরো। গত বিশ্বকাপে হয়েছিলেন ১৭তম। রিকার্ভে তাঁর সেরা স্কোর ৬৭৯। এশিয়ান গেমসে ৬৮৫-৬৯০ স্কোরে পদক জেতা সম্ভব। এ জন্য ভালো করার স্বপ্ন দেখছেন তিনিও, ‘সুইজারল্যান্ডের বৃত্তি পাওয়াটা বিশেষ কিছু আমার জন্য। গত এশিয়ান গেমসের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার ভালো করতে চাই আরো।’

জাকার্তায় যাচ্ছেন ১৩ আর্চার। রিকার্ভ দলে আছেন আশা-ভরসার প্রতীক রোমান সানা, তামিমুল ইসলাম, ইব্রাহিম শেখ রেজওয়ান, ইমদাদুল হক মিলন, নাসরিন আক্তার, ইতি খাতুন ও বিউটি রায়। কম্পাউন্ড ইভেন্টে খেলবেন অসীম কুমার দাস, আবুল কাশেম মামুন, জাবেদ আলম, বন্যা আক্তার, রোকসানা আক্তার, সুমা বিশ্বাস। তাঁদের কেউ না কেউ উঁচিয়ে ধরবেন বাংলাদেশের পতাকা, এতটুকু আশা নিয়েই রোমান-বন্যারা যাচ্ছেন জাকার্তায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here