জাতীয়

সাবেরের সঙ্গে আব্বাস না শিরিন সুলতানা?

রাজধানীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা নিয়ে ঢাকা-৯ আসনে নির্বাচনী তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। খিলগাঁও-সবুজবাগ-মুগদা থানার ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭নং ওয়ার্ড এবং সাবেক নাসিরাবাদ, মান্ডা, দক্ষিণগাঁও ইউনিয়ন বর্তমানে নতুন ওয়ার্ড ৭১, ৭২, ৭৩, ৭৪ ও ৭৫নং নিয়ে গঠিত এ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা বাড়িয়েছেন জনসংযোগও। আড্ডা-আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে অনেকের নাম শোনা গেলেও মূল আলোচনায় আছেন দু’জন। এরা হচ্ছেন- আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি সাবের হোসেন চৌধুরী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। বড় দুই দলের বাইরে এ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান। এলাকায় তার ছবিসংবলিত পোস্টারও ঝুলছে মোড়ে মোড়ে। এলাকা ঘুরে এবং নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বর্তমান এমপি সাবের হোসেন চৌধুরীই এগিয়ে রয়েছেন। দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরাও প্রার্থী হিসেবে সাবেরকেই চাচ্ছেন। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি হিসেবে এলাকায় তার সুনাম রয়েছে। নিজ দল ছাড়াও ব্যক্তি হিসেবে সাবের হোসেন চৌধুরীর সর্বস্তরের মানুষের কাছে রয়েছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা। স্বচ্ছ ইমেজের কারণেই তিনি তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। অপরদিকে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জোর আলোচনায় আছেন দলের প্রভাবশালী নেতা মির্জা আব্বাস। মামলার কারণে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে পারেননি তিনি। তার জায়গায় নতুন মুখ হিসেবে মনোনয়ন পান মহিলা নেত্রী শিরিন সুলতানা। তবে এবার ঢাকা-৮ ও ৯ দুই আসন থেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন মির্জা আব্বাস।

১৯৯৬ ও ২০০১ সালে এ আসনটি ছিল ঢাকা-৬। তখন খিলগাঁও, বৃহত্তর সবুজবাগ, মতিঝিল ও পল্টন থানা নিয়ে এ আসন ছিল। ১৯৯৬ সালে মির্জা আব্বাসকে হারিয়ে সাবের হোসেন চৌধুরী প্রথমবার এমপি হন। ওই সময় আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি এলজিআরডি উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০০১ সালে বিএনপির মির্জা আব্বাসের কাছে পরাজিত হন সাবের। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আসন পুনর্বণ্টনের পর খিলগাঁও, মুগদা ও সবুজবাগ এলাকা নিয়ে ঢাকা-৯ আসন গঠিত হয়। সে সময় মামলার কারণে মির্জা আব্বাস নির্বাচন করতে না পারায় জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা মনোনয়ন পান। ওই নির্বাচনে বড় ব্যবধানে সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি হন। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনেও বিজয়ী হন সাবের।

আওয়ামী লীগ : ঢাকা-৯ আসনে এমপি সাবের হোসেন চৌধুরীর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা তাকে আগামীতেও মনোনয়নের ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে। ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন এবং রাশিয়ার সর্বোচ্চ পদক ‘অর্ডার অব ফ্রেন্ডশিপ’ প্রাপ্তি তাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তবে এবার হারানো জায়গা পুনরুদ্ধারে তৎপর হয়ে উঠেছেন এক সময়ের প্রতাপশালী আওয়ামী লীগ নেতা মোজাফফর হোসেন পল্টু। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এ এলাকায় দলের প্রার্থী ছিলেন তিনি। তার পাশাপাশি দু’একজন নবীন নেতাও নির্বাচনী মাঠ গোছানোর চেষ্টা করছেন।

স্থানীয় ভোটার এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকার উন্নয়নে সাবের চৌধুরীর অনেক অবদান। তিনি রাস্তাঘাট, স্কুল ও কলেজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাছাড়া জনগণের জন্য বরাদ্দ নিয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই। কিন্তু তিনি অনেকটা ধরাছোঁয়ার বাইরে। দলের নেতাকর্র্মীদের পাশাপাশি জনগণও তাকে কাছে পান না। প্রায়ই দেশের বাইরে যান। আর বসবাসও করেন নির্বাচনী এলাকার বাইরে।

আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে জানতে সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। একাধিকবার ফোন করে এবং এসএমএস পাঠিয়েও তার সাড়া মেলেনি।

তবে কথা হয় মুগদা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন বাহারের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে নেতাকর্মীরা আছেন। এমপি হয়ে এলাকার অনেক উন্নয়ন করেছেন তিনি। এলাকার মানুষ তাকেই আবার এমপি দেখতে চায়।

আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী মোজাফফর হোসেন পল্টু যুগান্তরকে বলেন, আমি দলের চরম দুঃসময়ে সংগঠন ধরে রেখেছিলাম। এক সময় অবিভক্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। সেই সূত্রে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। ঢাকা-৯ আসনের বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও অংশ নিচ্ছি। রাজনীতিক হিসেবে জনগণের সুখ-দুঃখের কথা জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংসদে তুলে ধরতে চাই।

এ ছাড়া মনোনয়ন প্রত্যাশায় এলাকায় বহু ব্যানার, ফেস্টুন ঝুলিয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন সরকার পলাশ। তিনি বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। জানতে চাইলে গিয়াস উদ্দিন সরকার পলাশ বলেন, নিয়মিত এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। সুখে-দুঃখে তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি, এ স্লোগান সামনে নিয়ে আমার সমর্থক নেতাকর্মীরা মাঠে কাজ করছে।’

বিএনপি : একাদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। বিএনপি সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপালনকারী এ নেতা আইনি জটিলতায় ২০০৮ সালে ভোটে অংশ নিতে পারেননি। এ আসনে মির্জা আব্বাসের স্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাসের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে স্বামী মির্জা আব্বাসের নির্বাচনী গণসংযোগে অংশ নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনায় আসেন তিনি। তবে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশা ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মির্জা আব্বাসই হতে পারেন এ আসনে বিএনপির প্রার্থী। আর তিনি প্রার্থী হলে সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। নির্বাচনী ভাবনা নিয়ে কথা হয় মির্জা আব্বাসের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন নিয়ে কথা বলার সময় আসেনি। দল নির্বাচনে অংশ নেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে এ ব্যাপারে মন্তব্য করা যাবে। তিনি বলেন, ঢাকা-৮ ও ৯ আসনের মানুষের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক। তারা চাচ্ছেন আমি এ আসন থেকেও নির্বাচন করি।

বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, মির্জা আব্বাসকে ঢাকা-৮ আসনে মনোনয়ন দেয়া হলে এ আসনে বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক শিরিন সুলতানাকে মনোনয়ন দেয়া হতে পারে। কয়েক বছর ধরে এলাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। জাতীয়ভাবেও এ মহিলা নেত্রীর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বিগত আন্দোলন সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার খুবই আস্থাভাজন। নবম সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে ধানের শীষের পক্ষে লড়াই করেন। স্থানীয়দের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। জানতে চাইলে শিরিন সুলতানা যুগান্তরকে বলেন, গত সরকারবিরোধী আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়ার চেষ্টা করেছি। জেল-জুলুম হুলিয়া মাথায় নিয়ে দলের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি দলের হাইকমান্ড বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেবে। তিনি বলেন, এলাকার অলিগলি আমার চেনা। ভোটারদের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক। তাদের যে কোনো প্রয়োজনে সাধ্যমতো করার চেষ্টা করছি।

এ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির প্রথম যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশীদ হাবিব। নব্বইয়ের দশকে অবিভক্ত সবুজবাগ ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন তিনি। পরে মহানগর ছাত্রদল দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অবিভক্ত মহানগরের কেন্দ্রীয় কমিটির কনভেনর হন। পরে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। তবে তার মনোনয়ন পাওয়া অনেকটা আব্বাসের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। সূত্র- যুগান্তর ।