খেলাধুলা

সাকিবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সাব্বির!

শেষ সুযোগ’ দিচ্ছেন যাঁকে, তিনি তা কাজে লাগালে তো!

সাব্বির শোধরাননি। মাঠের বাইরের নানা অপকর্মে নিত্যই আসছেন সংবাদ শিরোনামে। সর্বশেষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সমর্থকদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করে। আর ‘শেষ সুযোগ’ও তো শেষ হচ্ছে না। এবার যেমন স্বয়ং বোর্ড সভাপতি তিতিবিরক্ত হয়ে সাব্বিরকে তিন বছরের জন্য নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেখান থেকে সরে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে মোটে ছয় মাসের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিষেধাজ্ঞায়!

নববর্ষের আনন্দে শুরু হয়নি বছরটি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য বড় এক সতর্কঘণ্টাতেই বরং পথচলার শুরু। আগের নানা অপকর্মের সঙ্গে কিশোর দর্শক পেটানোর দায়ে সাব্বির রহমানকে দেওয়া হয় শাস্তি। কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বাদ, ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা এবং ২০ লাখ টাকা জরিমানা। সঙ্গে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসানের কড়া হুঁশিয়ারি, ‘এবার তো সাব্বিরকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিষেধাজ্ঞার কথাও উঠেছিল। আমরা ওকে শেষ সুযোগ দিচ্ছি।’

কিন্তু ‘শেষ সুযোগ’ দিচ্ছেন যাঁকে, তিনি তা কাজে লাগালে তো!

সাব্বির শোধরাননি। মাঠের বাইরের নানা অপকর্মে নিত্যই আসছেন সংবাদ শিরোনামে। সর্বশেষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সমর্থকদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করে। আর ‘শেষ সুযোগ’ও তো শেষ হচ্ছে না। এবার যেমন স্বয়ং বোর্ড সভাপতি তিতিবিরক্ত হয়ে সাব্বিরকে তিন বছরের জন্য নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেখান থেকে সরে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে মোটে ছয় মাসের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিষেধাজ্ঞায়!

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, মাঠের বাইরের ঘটনার শাস্তি কমেছে মাঠে সাব্বিরের প্রয়োজনীয়তার কারণে। ২০১৯ বিশ্বকাপে তাঁকে নাকি ভীষণ, ভীষণ, ভীষণই দরকার বাংলাদেশের। ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাসহ সিনিয়র ক্রিকেটার ও টিম ম্যানেজমেন্টের সুপারিশে তাই কমে এসেছে  শাস্তি। তাতে জাতীয় দলের ড্রেসিংরুম তো বটেই, বয়সভিত্তিক দল এমনকি পুরো দেশে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোর-তরুণদের মধ্যে কী প্রভাব পড়বে—তা ভেবে দেখেননি কেউ। ক্রিকেটটা ঠিকঠাক খেললে মাঠের বাইরে যা খুশি তাই করার লাইসেন্স পাওয়ার বার্তাই যে সাব্বিরের এই শাস্তি কমানোর প্রক্রিয়ায়!

তা ওই মাঠের ক্রিকেটেই-বা কী এমন পারফরম্যান্স তাঁর? ২০১৯ বিশ্বকাপে সাব্বিরের থাকা না থাকায় কী অমন আকাশ-পাতাল পার্থক্য হবে বলে মনে করছেন টিম ম্যানেজমেন্ট? তাঁর ওয়ানডে ক্যারিয়ারের গভীরে গিয়ে দেখাই যাক তাহলে!

২০১৪ সালের ২১ নভেম্বর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে ফরম্যাটে অভিষেক সাব্বিরের। এখন পর্যন্ত ৫৪ ম্যাচ খেলে রান ১০৫৪। পঞ্চাশ পেরোনো ইনিংস মোটে পাঁচটি। সেঞ্চুরি নেই কোনো, সর্বোচ্চ ইনিংস ৬৫ রানের। ২৪.৫১ গড়ও তাঁর ব্যাটিং সামর্থ্যের কোরাস গাইছে না।

আরেকটু বিশ্লেষণ করা যাক। ৫৪ ওয়ানডের মধ্যে ৪৮ ইনিংসে ব্যাট হাতে ক্রিজে যান সাব্বির। এর মধ্যে দুই অঙ্কে পৌঁছার আগে চটজলদি প্যাভিলিয়নে ফেরেন ১৬ বার। অর্থাত্ প্রতি তিন ইনিংসে একবার সাব্বির আউট ১০ রানের নিচে। ১০ থেকে ২০ এর মধ্যে আরো ১২ ইনিংসে। তার মানে, ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৪৮ ইনিংসের ভেতর (১৬+১২) ২৮ ইনিংসে ২০ রানও করতে পারেননি সাব্বির। শতাংশ হিসেবে যা ৫৮.৩৩। অর্থাত্, প্রতি তিন ইনিংসের মধ্যে প্রায় দুটিতে তিনি আউট ২০-এর মধ্যে।

তৃতীয়াংশের বাকি যা অংশ, তাতেও যে হাতিঘোড়া মেরেছেন—এমন নয়। হ্যাঁ, ঝোড়ো কিংবা অন্যদের সঙ্গ দেবার মতো কিছু ইনিংস খেলেছেন। কিন্তু চার বছর টানা খেললে অমন কিছু ইনিংস তো থাকবেই। আর জাতীয় দলের ওয়ানডে সেটআপে সাব্বিরের অবদান এমন নয় যে, তাঁকে বিশ্বকাপ দলে পাওয়ার জন্য অমন মরিয়া হতে হবে অধিনায়কসহ সিনিয়র ক্রিকেটারদের; টিম ম্যানেজমেন্টের।

তাঁর সাম্প্রতিক ফর্মটাও দেখে নেওয়া যাক চট করে। গেল বছর ডাবলিনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সর্বশেষ ফিফটি। এরপর চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ, শ্রীলঙ্কা-জিম্বাবুয়েকে নিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে নিষ্ফলা সাব্বিরের ব্যাট। এ সময়ে খেলা ১৫ ওয়ানডেতে ১৫.৬১ গড়ে মোটে ২০৩ রান।

অভিষেকের পর আর কখনো ওয়ানডে দল থেকে বাদ পড়েননি সাব্বির। স্কোয়াড তো বটেই, একাদশ থেকেও না। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ‘পঞ্চপাণ্ডব’-এরও এমন ধারাবাহিকতা নেই। এ সময়কালে বিভিন্ন কারণে মাশরাফি, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল ও মাহমুদ উল্লাহ কিছু ম্যাচ মিস করেছেন। তবে টানা খেলে গেছেন সাব্বির। তাতে তাঁর সামর্থ্যের প্রতি অধিনায়ক ও টিম ম্যানেজমেন্টের অকুণ্ঠ সমর্থনের ঘোষণা দেয়। অথচ টানা ৫৪ ম্যাচ খেলেও একটিবারের জন্যও ম্যাচসেরা হতে পারেননি সাব্বির।

যদিও এ সময়কালে ভূরি ভূরি ম্যাচ জিতেছে বাংলাদেশ। ৫৪ ম্যাচের মধ্যে জিতেছে ৩০টিই। এর ২৯টিতে ম্যাচসেরা বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। সর্বোচ্চ সাতবার তামিম ইকবাল। সাকিব আল হাসানের হাতে সে পুরস্কার উঠেছে পাঁচবার; মুশফিকুর রহিমের চারবার; সৌম্য সরকার ও মুস্তাফিজুর রহমানের হাতে তিনবার করে। এ ছাড়া দুবার করে ম্যাচসেরা হন মাশরাফি বিন মর্তুজা ও মাহমুদ উল্লাহ। আর একবার করে ইমরুল কায়েস, এনামুল হক, এমনকি তাইজুল ইসলাম পর্যন্ত। কিন্তু কোনো ওয়ানডে শেষেই পুরস্কারমঞ্চে ডাক পড়েনি সাব্বিরের।

তবু তাঁর জন্য সুপারিশ করে কমিয়ে আনা হয় শাস্তি!

নাজমুল হাসানের নেতৃত্বাধীন এই বিসিবি সাকিবের মতো মহাতারকাকে নিষিদ্ধ করেছে দফায় দফায়। ক্যামেরার সামনে অশোভন আচরণের জন্য তিন ম্যাচ নিষিদ্ধ করেছিল। পরে আচরণগত সমস্যার কারণে ছয় মাসের জন্য। সাকিবকে বাংলাদেশ দলের ভীষণ প্রয়োজন জেনেও অমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধেনি বোর্ডের। সাব্বির তো আর সাকিব নন। তবু তাঁর বেলায় কী ‘কোমল’ বিসিবি!

সাকিবের ওই নিষেধাজ্ঞার ‘সুফল’ দীর্ঘ মেয়াদে ঠিকই পেয়েছেন সাকিব স্বয়ং এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট। সাব্বিরের প্রতি নমনীয়তার ‘কুফল’ও পাবে নিশ্চিতভাবে। তা-ও যদি সাব্বিরের মাঠের পারফরম্যান্স সাকিবের মতো হতো!