জাতীয়

সমুদ্র পর্যটনে সম্ভাবনার হাতছানি

মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র জয়ের ছয় বছর পেরিয়ে গেছে। সমুদ্র অর্থনীতি (ব্লু-ইকোনমি) এখনো ‘সম্ভাবনার’ মধ্যেই সীমিত। সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনেরও বিকাশ ঘটছে না। বিশাল বঙ্গোপসাগরকে পর্যটন আকর্ষণে ব্যবহারের উদ্যোগ নিলে বিদেশি পর্যটক বাড়ানো সম্ভব। এ জন্য সামুদ্রিক পর্যটনে বিনিয়োগ বাড়ানো, দক্ষ জনবল তৈরি, ভিসা সহজীকরণ, প্রধান গন্তব্যগুলোতে ইমিগ্রেশন, কাস্টমসসহ অবকাঠামো তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে ৭১০ কিলোমিটার লম্বা উপকূল রেখা ছুঁয়ে আছে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে উপকূলীয় ভূখণ্ডের আয়তন ৪৭ হাজার ২০১ বর্গকিলোমিটার। উপকূল ও সমুদ্র ছোট-বড় মিলিয়ে ৭৫টি দ্বীপ রয়েছে বাংলাদেশের। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজ ইনস্টিটিউট প্রকাশিত একটি মানচিত্রে দেখানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক সালিসিতে সীমানা নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশের সমুদ্র প্রদেশের মোট আয়তন এক লাখ ২১ হাজার ১১০ বর্গকিলোমিটার। এই উপকূলীয় ও সামুদ্রিক অঞ্চলে রয়েছে অনেক ধরনের প্রাণবৈচিত্র্যসমৃদ্ধ এলাকা; যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্থানও হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে গভীর সমুদ্রের জলজ প্রাণবৈচিত্র্য, প্রবাল বসতি, সামুদ্রিক ঘাসকেন্দ্রিক জলজ বসতি, বালুময় সমুদ্রসৈকত, বালিয়াড়ি, জলাভূমি, প্লাবন অববাহিকা, মোহনা, উপদ্বীপ, লেগুন, নানা ধরনের দ্বীপ এবং ম্যানগ্রোভ। দেশের মোট ২৫টি প্রাণ-প্রতিবেশগত অঞ্চলের মধ্যে ১১টিই উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত, আরো চারটির অংশবিশেষ এ অঞ্চলে পড়েছে। এই অঞ্চলে ১০টি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য, পাঁচটি জাতীয় উদ্যান এবং ১৭টি মৎস্য অভয়ারণ্য রয়েছে। এগুলোকে পর্যটনের প্রসারে কাজে লাগাতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে বলে জানান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. শেখ আফতাব উদ্দীন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, “সাগরে পর্যটনের সম্ভাবনা অফুরন্ত। উন্নত বিশ্বের পর্যটকরা পাঁচতারা মানের জাহাজে চড়ে সাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। মেরিন অফসোর ট্যুরিজমের মাধ্যমে তাঁদের বঙ্গোপসাগরমুখী করার সুযোগ সুবর্ণ সুযোগ আছে। এসংক্রান্ত পর্যটন প্রডাক্ট তৈরিতে প্রয়োজনীয় অককাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। কক্সবাজার বা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজ ছেড়ে কুতুবদিয়া চ্যানেল পর্যন্ত কিংবা সেখান থেকে কলকাতা বন্দর কিংবা মালদ্বীপ আসা-যাওয়া করতে পারে। আমাদের দেশের যারা থাইল্যান্ডের পাতায়া, মালয়েশিয়ার লাংকাইউ, মালদ্বীপ কিংবা ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে যাচ্ছে তাদের জন্যও এই সুযোগ আরো উন্মোচন করা দরকার। সেন্ট মার্টিনসকে মায়ামি বিচ বানিয়ে সরকার সেখান থেকে বছরে কয়েক শ কোটি টাকা আয় করতে পারে। এ জন্য সেন্ট মার্টিনসকে ‘এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।”

বেশির ভাগ স্বল্পোন্নত দেশ পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে অর্থনীতি সুসংহত করেছে। জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৪৮টি স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে ২০টিতেই পর্যটন হচ্ছে রপ্তানি আয়ের প্রধান বা দ্বিতীয় প্রধান উৎস। অনেক উন্নয়নশীল দেশে, বিশেষত ক্ষুদ্র দ্বীপ দেশগুলোতে মোট জাতীয় উৎপাদনের ২৫ শতাংশই পর্যটন থেকে আসছে। তাই টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা (এসডিজি) বাস্তবায়নে পর্যটনের ভূমিকা বাড়াতে সামুদ্রিক পর্যটনে জোর দিতে হবে বলে জানান বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের আন্তর্জাতিক ক্রজ শিপ পর্যটনে আমাদের অনেক সম্ভাবনা আছে। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে কাজ করতে হবে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি এবং ভিসাব্যবস্থা সহজীকরণ প্রয়োজন। এ জন্য দ্রুত ই-ভিসা চালু করা এখন সময়ের দাবি। এতে শুধু পর্যটন নয়, ব্যাবসায়িক ভ্রমণও বাড়বে বাংলাদেশে।’

এদিকে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকবাহী জাহাজ নিয়ে এসেছে ‘জার্নি প্লাস’। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ‘সিলভার সি ক্রুজ’ জাহাজে করে পর্যটকরা সুন্দরবন, মহেশখালী, চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিদর্শন করেন। আন্তর্জাতিক এই ক্রুজ শিপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ১০০ জন পর্যটক এসেছিলেন। ২০১৯ সালে আরো বড় পর্যটকবাহী নিয়ে আসার কথা জানান ট্যুর অপারেটরস অব বাংলাদেশের (টোয়াব) পরিচালক ও জার্নি প্লাসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তৌফিক রহমান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ওশান ক্রুজের সঙ্গে বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করতে আমরা ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে তিনটি ক্রজ শিপে ৩০০ পর্যটক আনতে যাচ্ছি। এটি চেন্নাই থেকে করে বাংলাদেশে ঢুকবে। এরপর সেটি কলকাতা হয়ে আবার বাংলাদেশ হয়ে ইয়াঙ্গুন, শ্রীলঙ্কা হয়ে চলে যাবে।’

তৌফিক রহমান বলেন, ‘ক্রজ ট্যুরিজমে এই অঞ্চলে সবচেয়ে সক্রিয় শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও ভারত। ভারতের কোচিন, গোয়া, মুম্বাই, চেন্নাইতে প্রতিবছর ৪৫টি ক্রজ শিপ আসে। আমরা মাত্র একটি ক্রজ শিপ আনতে পেরেছি, আরো ৪৪টি জাহাজ আমাদের বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে ঘোরাফেরা করে, যার সুফল আমরা কাজে লাগাতে পারছি না।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছ থেকে ভিসা পলিসিতে এয়ারপোর্ট ও ল্যান্ড পোর্ট আছে। এটি সংশোধন করে তার মধ্যে সিপোর্ট যুক্ত করতে হবে। তাহলে আমাদের আলাদা করে সরকারের কাছে অনুমতি নিতে হবে না। পর্যটকরা আরো বেশি বেশি আসতে পারবেন। এ ছাড়া বন্দরের অবকাঠামো উন্নত ও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। ভারতের সঙ্গে নৌ প্রটোকলসংক্রান্ত এমওইউ হয়ে গেছে। এখন আরেকটি এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর) স্বাক্ষর হওয়ার কথা; কিন্তু এটি ঝুলে আছে। এ মাসে এটি স্বাক্ষর হলেই অক্টোবরে কলকাতা থেকে ঢাকা হয়ে গোহাটি পর্যন্ত আমরা একটি জাহাজ পরিচালনা করব। আমরা এসওপির জন্য অপেক্ষায় আছি।’

জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মুহিবুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নদীভিত্তিক পর্যটন নিয়ে কাজ করছি। এখনো সামুদ্রিক পর্যটন নিয়ে সেভাবে কাজ শুরু করতে পারিনি। ভবিষ্যতে সাগরে পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) গভর্নিং বডির সদস্য জামিউল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পর্যটক আকর্ষণে আমাদের অনেক কিছুই আছে, কিন্তু আমরা তা কাজে লাগাতে পারছি না। পর্যটন নিয়ে আমরা স্থলেও যেমন ব্যর্থ হচ্ছি, সাগরও তার ব্যতিক্রম নয়। সাগরকেন্দ্রিক পর্যটনের প্রডাক্টের অভাব নেই। এগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করে পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি বা পিপিপির মাধ্যমে বিনিয়োগ আনা যেতে পারে। এ ছাড়া দেশে বর্তমানে যারা ক্রুজ শিপ পরিচালনা করছে তাদেরকে কর ছাড়সহ কিছু সুবিধা দিয়ে আরো উৎসাহিত করলে আরো অনেকে আসবে। তখন সরকার এ খাত থেকে ভালো রাজস্ব পাবে এবং দেশে বিদেশি পর্যটক আগমনও বাড়বে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের যে সমুদ্রসম্পদ রয়েছে তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো পর্যটনসম্পদ, যা সমুদ্রতীর থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এর মূল পর্যটক আকর্ষণ হচ্ছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য। তাই এই আকর্ষণগুলোকে পর্যটন পণ্যে রূপান্তর করার জন্য যেসব লজিস্টিকস এবং সাপোর্ট সার্ভিসেস দরকার সেগুলোকে চিহ্নিত করে পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করতে হবে। আর এ জন্য চাই সুষ্ঠু পর্যটন ব্যবস্থাপনা, যার মধ্যে থাকবে এসব পর্যটনসম্পদ চিহ্নিতকরণ, স্তরীকরণ, সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন। এর পরই শুধু সঠিক বিপণনের মাধ্যমে তা সোর্স বা টার্গেট মার্কেটে বিক্রি করে ক্যাশ করা যাবে, নইলে নয়। আর এ জন্য নানা কারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে হবে সরকার তথা সরকারি খাতকে, যা শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই নয়, বিদেশে দেশের পরিচিতি ও ভাবমূর্তি বিনির্মাণেও অপরিহার্য বটে।’

উপকূলীয় ও সামুদ্রিক পর্যটনকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে আইনি পরিকাঠামো তৈরির পরামর্শ দিয়ে বেসরকারি সংস্থা বে অব বেঙ্গল ওশান স্টুয়ার্ডশিপের ফ্যাসিলিটেটর মোহাম্মদ আরজু কালের কণ্ঠকে বলেন, “সামুদ্রিক পর্যটনের ক্ষেত্রে প্রাণবৈচিত্র্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ এসব প্রাণী ও পরিবেশই প্রকৃত অর্থে প্রধান ট্যুরিজম আকর্ষণ। সাগরে পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পর্যটকদের উপযোগী ‘সংরক্ষিত অঞ্চল’ চিহ্নিত করতে হবে।

অন্যান্য দেশের মতো সমুদ্রে ‘মেরিটাইম পার্ক’ স্থাপন করা যেতে পারে। সমুদ্রের তলদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। এ ছাড়া মেরিটাইম পার্ক স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদির জন্য ‘ন্যাশনাল মেরিন পার্ক অথরিটি’ গঠন প্রয়োজন। এসব স্থান সম্পর্কে বিদেশি পর্যটকদের জানাতে সরকার ও ট্যুর অপারেটরদের সমন্বয়ে একটি যৌথ বিপণন কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।”