অর্থনীতি

সব সুবিধা সরকারি চাকুরেদের

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য গৃহনির্মাণ ঋণের ঘোষণা দিয়েছেন। সরকারি কর্মচারী, বিশেষ করে নবীন কর্মকর্তারা যেন চাকরির শুরুতেই একটি ফ্ল্যাট বা বাড়ির মালিক হতে পারেন সে জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। ওই নীতিমালার আওতায় একজন সরকারি কর্মচারী দেশের যেকোনো স্থানে ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি নির্মাণের জন্য ঋণ পাবেন। সহনীয় ও পরিশোধযোগ্য সুদে এ ঋণ দেওয়া হবে। আগামী বছরই এ ঋণ কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় অবশ্য বস্তিবাসী ও ভাসমান মানুষের জন্য গৃহনির্মাণের কোনো উদ্যোগের কথা নেই। কুমিল্লা, সিরাজগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ শহরে বস্তিবাসীদের অংশগ্রহণে গোষ্ঠীগত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তাদের বসতি স্থাপনের পুরনো প্রকল্পের কথাই তিনি বলেছেন। অন্তত ২২ লাখ ভাসমান মানুষ ও বস্তিবাসী মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান  ব্যুরোর (বিএসএস) এই হিসাব চার বছর আগের। এখন এই সংখ্যা আরো বেড়েছে।

অর্থমন্ত্রী গৃহনির্মাণ ঋণের ঘোষণা দিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের উদ্যমী হতে বলেছেন। তাঁরা সর্বত্র সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হবেন বলে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী সরকারি চাকুরেদের পেনশন সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁরা যেন চাকরি শেষে অবসরকালেও নিরবচ্ছিন্ন আয়প্রবাহে থাকতে পারেন তা নিশ্চিত করেছেন। এমনকি তাঁদের মূল্যস্ফীতির প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য ইনক্রিমেন্ট চালু করেছেন। অবসরপ্রাপ্ত চাকুরেদের মৃত্যুর পর তাঁদের বিধবা স্ত্রীর জন্য আজীবন চিকিৎসা ভাতা এবং দুটি উৎসব ভাতা চালু করার কথা জানিয়েছেন। পেনশন দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করারও ঘোষণা দিয়েছেন। ঘরে বসে মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে পেনশনের টাকা স্থানান্তরের কথা তাঁরা জানতে পারবেন।

গত ১০ বছরের বাজেট বক্তৃতায়ই সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন সংস্কারের কথা রয়েছে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের পেনশনের কথা আগে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু এবার বাজেট বক্তৃতায় বেসরকারি চাকরিজীবীসহ সর্বজনীন পেনশনের কথা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিদ্যমান সরকারি পেনশন কাজের বাইরে বেসরকারি পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত সব কর্মজীবী মানুষের জন্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করতে চাই।’ প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় সরকার পরিচালিত স্কিমে নিবন্ধন করে একজন কর্মজীবী মাসিক ভিত্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা জমা করবেন। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষও একটা নির্দিষ্ট অংশ কর্মজীবীর পেনশন হিসেবে জমা করবে। হতদরিদ্র শ্রমজীবীদের ক্ষেত্রে তাদের অংশের অতিরিক্ত হিসেবে সরকার পূর্বঘোষণা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ওই হিসাবে জমা করবে। এর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গঠিত তহবিল বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয় সর্বজনীন পেনশন তহবিলে জমা হতে থাকবে। ক্রমপুঞ্জীভূত চাঁদা ও আয়ের পরিমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অবসরকালে মাসিক পেনশন পাবেন। একটি টেকসই সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা প্রবর্তনের কাজ এ অর্থবছরেই শুরু করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী। অন্তত কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে চালু করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন তিনি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, দেশের মোট বয়স্ক জনসংখ্যার মধ্যে পেনশনভোগীর সংখ্যা অতি সামান্য। শুধু সরকারি চাকরিজীবী ও কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার সাত থেকে আট লাখ পরিবার নিয়মিত পেনশন পেয়ে থাকে। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরেদের বাইরে হতদরিদ্র ৩৫ লাখ লোক (মোট বয়স্ক জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ) মাসিক ৪০০ টাকা হারে বয়স্ক ভাতা পাচ্ছে। তাদের ভাতার পরিমাণও মানসম্মত জীবনধারণের পক্ষে যথেষ্ট নয়। তাই সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের বাইরে গিয়ে সবার জন্য পেনশন ব্যবস্থা চালু করতে পারলে দেশে একটি বড় কাজের সূচনা হবে। তবে কাজটি অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ। অর্থমন্ত্রী শুরু করে দিয়ে যেতে পারলে শুভ সূচনা ঘটবে।

বাংলাদেশ সচিবালয় সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি নিজামুল ইসলাম ভূঁইয়া গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম অর্থমন্ত্রী আমাদের বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দেবেন। তাঁর এ ঘোষণা না পেয়ে আমরা হতাশ হয়েছি। তবে বাজেটের পরও এ ধরনের ঘোষণা আসতে পারে। বাজারদর যে পরিমাণ বেড়েছে এবং যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে তা বিবেচনায় নিয়ে অর্থমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আমরা আশা করি।’

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাজেট পাস হওয়ার পরও সরকার নির্বাহী আদেশে চাকরিজীবীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে থাকে। গত বছর বাজেট পাস হওয়ার পর সচিবদের ডমেস্টিক অ্যাইড অ্যালাউন্স বেড়েছে এবং নগদায়ন করার নীতি কার্যকর হয়েছে। সম্প্রতি সরকার শীর্ষ পর্যায়ের আমলা, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের মোবাইল ফোন সেট কেনার খরচের পরিমাণ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বাড়িয়েছে টেলিফোন বিল ব্যয়ের হারও। এর আগে সরকারি চাকুরেদের সন্তানদের শিক্ষা ভাতার পরিমাণও বেড়েছে বাজেট বক্তৃতার বাইরে।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা পীযূষ কান্তি দে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে সরকারি চাকরিকে লোভনীয় করে তোলা হয়েছে। সম্প্রতি কোটাবিরোধী যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে তার পেছনেও রয়েছে সরকারি চাকরির লোভনীয় হাতছানি। সব সুবিধাই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য। সরকারের দিক থেকে বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কোনো উদ্যোগ নেই। সরকারের দায় শুধু সরকারি কর্মচারীদের জন্য নয়, বেসরকারি চাকরিজীবীদের প্রতিও রয়েছে। বেসরকারি চাকরিতে বছর শেষে একটা ইনক্রিমেন্ট হবে কি না তা মালিকের ওপর নির্ভর করে। তারা চাইলে হবে, না চাইলে হবে না। বেসরকারি পর্যায়ে দিতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এর পরও এবার সর্বজনীন পেনশনের বিষয়টি নতুন। আশা করি, বিষয়টি কার্যকর করা হবে।’

জনপ্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সরকারি চাকরিতে সুবিধার ছড়াছড়ি। তাঁদের কল্যাণের জন্য সরকার কী করেছে তার ফিরিস্তি রয়েছে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায়। সেখানে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল দেওয়া হয়েছে, যা আগের তুলনায় দ্বিগুণ। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণে শিক্ষা অনুদান ও চিকিৎসা অনুদান রয়েছে। এমনকি সরকারি চাকুরের দাফন বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুদানও রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত অবস্থায় মারা গেলে আট লাখ টাকা এবং গুরুতর আহত হয়ে অঙ্গহানি হলে দুই লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়।