ঢাকা বিভাগ

রাজধানীতে হেরেমখানা আর ৮ রক্ষিতা রাখার ঘটনা যা শুনলে চমকে যাবেন !

এফপি

ডেস্কনিউজ; ওনেক বড় ব্যাবসায়ী তিনি, ছিলেন অগনিত টাকার মালিক। দুই স্ত্রী থাকলেও কাছে রাখতেন না তাদের। কাছে থাকতেন তার আট সঙ্গিনী। ধর্মকর্মে ছিলেন না এই ব্যবসায়ী। শুধু আধ্যাত্মিক ‘কালী সাধনায়’ মত্ত থাকতেন।

তার সেই আট সঙ্গিনীকে নিয়ে আসর জমিয়ে রাতভর ‘কালী সাধনা’ করতেন। তার আলিশান বাড়িতে চোখ-ধাঁধানো ঝাড়বাতির আলোর নিচে গড়ে তুলেছিলেন এক অন্ধকার জগৎ। সেই জগৎ তিনি চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ রাখতে পারলেও তার নৃশংস মৃত্যুতে সেসব রহস্যময় ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়।

এক রাতে তার এই সাজানো-গোছানো হেরেমখানা তছনছ হয়ে যায়। দুর্বৃত্তরা তাকে জবাই করে হত্যা করে। একই কায়দায় তারা হত্যা করে তার তিন সঙ্গিনীকে। রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় ফেলে রেখে খুনিরা পালিয়ে যায়।

রাজধানীর জুরাইনের আলম মার্কেটের কর্ণধার সেই ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলমের ঘটনা এটি। ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি রাতে দুর্বৃত্তরা তিন সঙ্গিনীসহ এই ব্যবসায়ীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তখন ওই ঘটনাটি সারা দেশে ব্যাপক আলোচিত হয়।

ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলমের মৃত্যুতেই তার জীবনযাপনের রহস্যময় ঘটনা একে একে ফাঁস হতে থাকে। আর এসব ঘটনা পুলিশ ও সাধারণ মানুষ জানার পর হতবাক। আলমের সঙ্গে নিহত হওয়া ওই তিন নারী হলেন কমলা, রহিমা ও সখিনা। তাদের বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। তাদেরও জবাই করে হত্যা করা হয়।

এ ছাড়া দুর্বৃত্তরা আলমের বাড়িতে থাকা বিপুল পরিমাণ টাকা, সোনার অলঙ্কারসহ মূল্যবান সামগ্রী লুটে নেয়। শুধু তাই নয়, নগদ টাকা লুট করতে দুর্বৃত্তরা ট্রাক আর টেম্পো ব্যবহার করে।

ঘটনার পরদিন সকালে পুলিশ ২৭৭ নম্বর নতুন জুরাইনের আলমবাগের বাসার দোতলা থেকে লাশ চারটি উদ্ধার করে। পুলিশ সেখান থেকে নগদ ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা উদ্ধার করে। যার বেশ কিছু উই পোকায় খাওয়া। এ ছাড়া ওই বাড়ির ভিতরে থাকা একটি চৌবাচ্চা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত বেশ কয়েকটি ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

তদন্তে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, হত্যাকাণ্ডের পর আলমের নিথর দেহটি টাকার বিছানার ওপর পড়ে ছিল। তিন রক্ষিতার লাশও পড়ে ছিল ছড়ানো-ছিটানো টাকার ওপর।

পুলিশ তখন জানায়, আলমের সঙ্গে যারা সেবাদানের কথা বলে থাকত, তারা প্রত্যেকেই তার রক্ষিতা। পরদিন ৩ জানুয়ারি আলমের মেয়ের জামাই মতিউর রহমান শ্যামপুর থানায় একটি মামলা করেন। আলমের পরিবার এ ঘটনাটিকে ডাকাতি বললেও পুলিশ তখনই নিশ্চিত হতে পারে যে, এটি পারিবারিক কোন্দলের জেরে ঘটেছে।

গোয়েন্দা পুলিশ আলমের অন্য পাঁচ রক্ষিতাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায়। এ ছাড়া ৪ জানুয়ারি গ্রেফতার করা হয় আলমের দুই ছেলেকে। মোহাম্মদ আলম ছোটবেলা থেকেই ছিলেন বেপরোয়া। তবে জমিদারের মতোই তার চালচলন ছিল।

তার জন্ম জুরাইনের করিম উল্লাহবাগে নানাবাড়িতে। দুই ভাই-বোনের মধ্যে আলম ছিলেন ছোট। তার দাদা মঙ্গল মিয়া ছিলেন কেরানীগঞ্জের জাজিরার জমিদার। বৃদ্ধ বয়সে মঙ্গল মিয়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সেই ঘরে জন্ম নেন আলমের পিতা সমন মিয়া।

মঙ্গল মিয়ার মৃত্যুর পর তার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর সন্তানরা জমিদারি ভাগাভাগি করে নিয়ে সমন মিয়াকে বঞ্চিত করেন। সৎ ভাইদের বঞ্চনার শিকার সমন মিয়া স্ত্রী হাজেরাকে নিয়ে করিম উল্লাহবাগে শ্বশুরবাড়িতে ওঠেন। সেখানেই জন্ম হয় মোহাম্মদ আলমের। লেখাপড়ায় মন ছিল না আলমের। পিতা সমন মিয়া সাত-আট বছর বয়সেই আলমকে কাজ শেখার জন্য জুরাইনের হাজী মোরশেদ আলী সরদারের ডায়মন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে দিয়ে দেন।

কঠোর পরিশ্রমী আলম নিজে কাজ করে পাওয়া টাকা জমিয়ে এবং মা হাজেরা বেগমের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে ১৫-১৬ বছর বয়সেই পোস্তগোলায় জনৈক ইসমাইলের জমিতে একটি ওয়ার্কশপ গড়ে তোলেন। আলমের জীবনের প্রথম ব্যবসা ছিল পুরনো ড্রাম কেটে তা দিয়ে পাইপ তৈরি করে বাজারে বিক্রি করা। সেই সময়ে এই পাইপের ব্যবসা থেকেই মূলত তার উত্থান হয়।

পরে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ডিআইটি) করিম উল্লাহবাগে তার মায়ের জমি ও পোস্তগোলায় নিজের ওয়ার্কশপের জমি অধিগ্রহণ করে নেয়। ক্ষতিপূরণ হিসেবে আলম বেশকিছু টাকা পেয়ে যান। এই টাকার একটি অংশ দিয়ে তিনি তার ব্যবসা বড় করেন। এরপর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। স্টিল মিল, রি-রোলিং মিল, আবাসন ব্যবসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া জুরাইনে তিনি যে বাড়িতে থাকতেন তা ছিল ২ বিঘার ওপর।

জানা গেছে, ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত আলম নিয়মিত নামাজ-কালাম পড়তেন। এরপর তিনি আধ্যাত্মিক লাইনে চলে যান। কালী সাধনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। টাকা-পয়সা, সম্পদের মতো নারীর প্রতিও আসক্তি ছিল আলমের। নিজের বাড়িতেই তিনি গড়ে তোলেন হেরেমখানা। দুই স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও ফরিদা নামে এক রক্ষিতার নেতৃত্বে তার ছিল গৃহপরিচারিকা নামে একদল যুবতী।

যেদিন যাকে পছন্দ, সেদিন তাকেই তার শয্যাসঙ্গী বানাতেন। কখনো কখনো আবার একাধিক নারীও তার শয্যাসঙ্গী হতেন। কালী সাধনার আগে তিনি দুধ দিয়ে গোসল করতেন। আর এই গোসল করিয়ে দিতেন তার রক্ষিতারা।

পুলিশ তদন্তে জানতে পারে, এই আট রক্ষিতাকে সবসময় তালাবদ্ধ করে বাসায় রাখা হতো। প্রতিদিন রাত ৯টায় আলম বাসায় ঢুকতেন। পরদিন সকাল ৯টায় বেরিয়ে যেতেন। বাকি সময় রক্ষিতাদের তালা মেরে ঘরের ভিতর রাখা হতো।

সূত্র জানায়, অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড আর প্রবল নারী আসক্তির কারণে আলমের বিবাহিত জীবন মোটেও সুখের ছিল না। দুই স্ত্রী অনেক চেষ্টা করেও তাকে ফেরাতে না পেরে নিজেরাই আলাদা হয়ে যান। আলম অবশ্য দুই স্ত্রীকেই আলাদা বাড়ি এবং সচ্ছল জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। দুই সংসারে তিন ছেলে আর পাঁচ মেয়ের সঙ্গেও তার সম্পর্ক মধুর ছিল না। অঢেল সম্পত্তি থাকলেও ছেলেদের হাতে কিছুই ছেড়ে দেননি তিনি।

বরং ছেলেদের বলতেন, ‘তোমরা যত দিন নিজেরা কিছু করতে না পারবে, তত দিন আমার অফিসে প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে বসবে এবং ১ হাজার করে টাকা নিয়ে যাবে।’ মেয়ে জামাইদেরও তিনি তার অভিন্ন অফিসে চাকরি দিয়েছিলেন।

জুরাইনের বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকায় দানবীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন আলম। সাহায্যের জন্য কেউ তার কাছে গিয়ে কিছু না পেয়ে ফিরে এসেছেন এমন উদাহরণ নেই। মা-বাবার নামে জুরাইনে স্কুল ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। এ ছাড়া কেরানীগঞ্জ ও জুরাইনের বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা ও মাজারে নিয়মিত আর্থিক সাহায্য দিতেন। শিল্পপতি আলমের হত্যা সে সময় সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

ঘটনার পরদিন শ্যামপুর থানায় জামাই মতিউর রহমান মতিন অভিযোগ করেন। মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে। কয়েক দিনের মাথায় আলমের দুই পুত্র নূর আলম বাবুল ও জহির আলম খোকনকে গ্রেফতার করা হয়। কয়েক মাস পরে মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। জামাই মতিনের দায়ের করা মামলায় চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়।

এরপর সিআইডি পরিদর্শক ফজলুর রহমান বাদী হয়ে জামাই বাবু, জামাই মতিন ও আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। চাঞ্চল্যকর আলম হত্যা মামলায় ১৪ আসামিকে খালাস ও তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় ; সুত্র বাংলাদেশ প্রতিদিন