বিশেষ প্রতিবেদন

যে কারনে ঈশ্বরদী-ঢাকা-ঈশ্বরদী রুটে বিমান চলাচল অত্যন্ত জরুরী

ভুবন বাংলা ডেস্ক রিপোর্ট : ঈশ্বরদী-ঢাকা-ঈশ্বরদী রুটে বিমানের ফ্লাইট চালু না থাকায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ প্রতিমাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অথচ পর্যাপ্ত সংখ্যক বিদেশীসহ প্রয়োজনের অতিরিক্ত সংখ্যক যাত্রী থাকা সত্ত্বেও ঈশ্বরদীতে চালুর পর ২২ বছর ধরেই বন্ধ রয়েছে ঈশ্বরদী বিমান বন্দর।
এবারের ঈদ যাত্রায় দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশী অবহেলিত ছিলো উত্তরবঙ্গের ঘরে ফেরা মানুষরা। কারন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যামে আটকে থেকে নিজ গন্তব্যে পৌছাতে হয়েছে তাদের। যা অবর্ণনীয়।
কিন্তু এসময় ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-সৈয়দপুরে অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল ঠিক থাকায় ওই অঞ্চলের মানুষের কিছুটা কষ্ট লাঘব হয়েছে।
ঠিক তখনই নতুন করে কথা উঠেছে ঈশ্বরদী-ঢাকা-ঈশ্বরদী রুটে বিমান চলাচল ও ঈশ্বরদী বিমান বন্দর চালুর বিষয় নিয়ে।
বিমান বন্দরে বিমান উঠানামা না করলেও প্রায়ই ঈশ্বরদী বিমান বন্দরে উঠানামা করছে ভাড়া করা হেলিকপ্টার।
এ বিমান বন্দর চালু না থাকায় পারমানবিক প্রকল্পে কর্মরত রাশিয়ানসহ অন্যান্য বিদেশী ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদস্থ কর্মকর্তারা জরুরী প্রয়োজনে বেশী টাকা খরচ করে হেলিকপটার ভাড়া করে ঈশ্বরদী আসছেন।
আবার মিটিং ও পরিদর্শন শেষ করে ভাড়া করা হেলিকপ্টার নিয়ে ঢাকায় ফিরে যাচ্ছেন।
একই অবস্থা ঈশ্বরদী ইপিজেড-এর বিদেশী বিনিয়োগকারীদের।

অথচ ঈশ্বরদী বিমান বন্দর চালুর বিষয়টি জরুরী হওয়া সত্বেও কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে না।
সূত্রমতে, ঈশ্বরদীতে অবস্থানরত প্রায় আড়াই হাজার রাশিয়ানসহ বিভিন্ন দেশের পাঁচ সহস্রাধিক বিদেশীরা বিমানে ভ্রমন করতে না পেরে প্রতিনিয়ত নানা অসুবিধার শিকার হচ্ছেন। তাদের কাজের গতি বৃদ্ধিতেও বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি হচ্ছে।
এছাড়া ঈশ্বরদী, টেবুনিয়া, পাবনা, ভেড়ামারা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, লালপুর, বাঘা, বড়াইগ্রাম, চাটমোহর, নাটোর অঞ্চলের হাজার হাজার যাত্রীরাও বিমানে চলাচল করতে না পেরে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানামুখী অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।
একইসাথে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রনালয়ও প্রতিমাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
পঞ্চান্ন বছর আগে পাকিস্তান আমলে নির্মিত ঈশ্বরদী বিমান বন্দরটিতে এক সময় প্রতিদিন দুটি করে ফ্লাইট চলাচল করতো। স্বাধীনতার পরও বেশ কিছুদিন এটি চালু ছিল এবং যাত্রী সংখ্যাও ছিল বেশী।
পার্শ্ববর্তী পাবনা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও নাটোরের যাত্রীরা ঢাকাতে যাতায়াত করতো ঈশ্বরদী বিমানবন্দর থেকে।
সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে এরশাদ সরকারের আমলে হঠাৎ করে রাজশাহীতে নতুন একটি বিমান বন্দর চালু করার পর থেকে যাত্রী সংকটের অজুহাত দেখানো শুরু হয়।
নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কর্মকর্তারা এ ষড়যন্ত্র শুরু করেন। এরই অংশ হিসাবে ১৯৮৭ সালে এই রুটে ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়া হয়।
বর্তমানেও শুধুমাত্র রানওয়ে প্রশস্ত না থাকার অজুহাত দেখিয়ে বেসরকারী বিমান সংস্থাগুলোও এ বিমান বন্দরটি ব্যবহারে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
সূত্রমতে, ঈশ্বরদীসহ নিকটস্থ এলাকার যাত্রীদের দাবির প্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালের ১৭ই জুলাই থেকে বিমান চলাচল শুরু হয়।
একইভাবে সিভিল এভিয়েশনের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারিরা নিজেদের সুবিধার্থে নানা অপকৌশলের আশ্রয় নিতে থাকে। এরই অংশ হিসেবে তিন বছর পর ১৯৯৬ সালের ৩ নভেম্বর লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে পুনরায় বিমান চলাচল বন্ধ করা হয়।
এর মধ্যে ২০১৩-১৪ সালে ৭ মাস চালু থাকলেও দীর্ঘ ২২ বছরই বিভিন্ন সময়ে ঈশ্বরদী বিমানবন্দর বন্ধ অবস্থায় রয়েছে।
১৯৯৬ সাল থেকে প্রায় দেড় যুগ বন্ধ থাকার পর দ্বিতীয় দফায় ২০১৩ সালের অক্টোবর চালু হয় ঈশ্বরদী বিমানবন্দর। এর সাত মাসের মাথায় লোকসানের অজুহাতে ২০১৪ সালের মে মাসে তৃতীয় দফায় বিমানবন্দরটি বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
একটি সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট বিভাগের অযোগ্য, অদক্ষ ও দূর্ণীতি পরায়ন কতিপয় কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণেই ঈশ্বরদীতে বিমানের ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে বিমানবন্দরটি বন্ধ থাকায় ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঈশ্বরদী ইপিজেড, ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট, ডাল গবেষণা কেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আসা দেশি-বিদেশি কর্মকর্তারা যাতায়াতে সমস্যায় পড়েছেন। সমস্যায় পড়েছেন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধরন যাত্রীরাও।
জানা যায়, ১৯৬০ সালে ৪১২ একর জমির ওপর ঈশ্বরদী বিমানবন্দরের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। ১৯৬৬ সালে কংক্রিটের রানওয়ে তৈরির পর ডিসি-৩ ও এফ-২৭ বিমান উঠানামা করতো।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিমানবন্দরটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এরপর ১৯৭২ সালে মেরামতের পর ঈশ্বরদী-ঢাকা-ঈশ্বরদী রুটে বিমান চালু করা হয়।
১৯৮৭ সালে লোকসানসহ নানা অজুহাতে বিমানবন্দরটি বন্ধ করে দেয়া হয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করে ১৯৯৪ সালে বিমানবন্দরটি আবার চালু করা হয়।
প্রায় তিন বছর বিমান চলাচল অব্যাহত থাকার পর ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় দফায় বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর ২০১৩ সালের ৩০ অক্টোবর তৃতীয় দফায় ঈশ্বরদী-ঢাকা রুটে বিমান চলাচল শুরু হয়।
ওই বছরের ১৮ নভেম্বর থেকে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের একটি এয়ারক্রাফট সপ্তাহে দু’দিন চলাচল শুরু করে।
সাত মাসের মাথায় ২০১৪ সালের ২২ মে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ কর্তৃপক্ষ প্রথম দিকে বিমানের ত্রুটি সারানো ও পরে রানওয়ের সমস্যার কথা বলে বিমান চলাচল বন্ধ করে দেয়।
ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের জনসংযোগ কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম সেই সময় জানান, তাদের বিমান চলাচলের জন্য রানওয়ের প্রস্থ একশ’ ফুট হওয়া দরকার, সেখানে রয়েছে ৭৫ ফুট। রানওয়ের প্রশস্থ করার কথা কর্তৃপক্ষকে জানালেও তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
তবে ঈশ্বরদী বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার জানান, এখানকার রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৭শ’ ফুট ও প্রস্থ ৭৫ ফুট।
ইউনাইটেড এয়ার এই রুটে ড্যাস-৮ বিমান ব্যবহার করত। এ ধরনের বিমান ওঠা-নামা করানোর মতো সক্ষমতা এ বিমানবন্দরের আছে।
ঈশ্বরদী বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুর রশীদ দাবি করে বলেন, ‘অগ্নিনির্বাপণের গাড়ি না থাকলেও ফ্লাইট পরিচালনার জন্য অন্যসব ব্যবস্থাপনা ঈশ্বরদী বিমানবন্দরের রয়েছে আমরা ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রস্তুত। এক সপ্তাহের নোটিশে ফ্লাইট পরিচালনার সব ব্যবস্থা করতে সক্ষম।’
ঈশ্বরদী বিমানবন্দর অতিসত্বর চালুর বিষয়টি অত্যন্ত জরুরী বলে মনে করছেন অনেকেই।
কারণ সড়কপথে ঈশ্বরদী থেকে ঢাকা যেতে যানজটের কারণে বর্তমানে ৭-১০ ঘন্টা সময় লাগে। ট্রেনের টিকেট প্রাপ্তিতে সমস্যা ছাড়াও সময় লাগে ৫ ঘন্টা।
এই অবস্থায় একদিকে সময়ের অপচয় অন্যদিকে বিড়ম্বনা। অথচ ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালু থাকলে অর্থ ও সময়ের অপচয় সাশ্রয় হতো।