জাতীয়

মৃত্যুর আগে যাদের নাম বলে গেছেন সাংবাদিক সুবর্ণা

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আনন্দ টিভির পাবনা প্রতিনিধি সুবর্ণা নদী (৩২) মৃত্যুর আগেই তার মা ও মেয়েকে হামলাকারীদের নাম বলে গেছেন। সাবেক স্বামী রাজীব ও রাজীবের সহকারী মিলনসহ কয়েকজন তাকে কুপিয়েছেন বলে হাসপাতালে আহতাবস্থায় জানিয়েছিলেন সুবর্ণা আক্তার।

বুধবার সকালে সুবর্ণার মা মর্জিনা বেগম বলেন, মেয়ে মৃত্যুর আগে হাসপাতালে হামলাকারীদের নাম আমাদের জানিয়ে গেছে। রাজীব ও তার সহকারী মিলনসহ কয়েকজন তাকে কুপিয়েছে। আমার মেয়ে তাদের চিনেছিল। র‌্যাব ও পুলিশকে আমি সব তথ্য জানিয়েছি। আমি তাদের ফাঁসি চাই।

নিহত সুবর্ণার মেয়ে জান্নাতও (৯) একই তথ্য পুলিশকে জানিয়েছে। স্বামীর পাশাপাশি সুবর্ণা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন তার কেয়ারটেকার ও সুবর্ণার শ্বশুর আবুল হোসেনকে সন্দেহ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে মঙ্গলবার রাতে সুবর্ণার শ্বশুর ও কেয়ারটেকার ইমরান হোসেনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তবে রাজীব এখনও পলাতক।

এদিকে এ ঘটনায় বুধবার সকালে নদী হত্যার প্রতিবাদে এবং হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে পাবনা শহরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের মানুষ।

পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, এ ঘটনায় মামলার প্রক্রিয়া চলছে। মা মর্জিনা বেগম বাদী হয়ে হত্যা মামলাটি করবেন। নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাবনা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। আমরা সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। তবে খুব শিগগির আমরা মূল হোতাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে পারব।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আবুল হোসেনের ছেলে রাজীবের সঙ্গে তিন-চার বছর আগে বিয়ে হয়েছিল সুবর্ণার। বছরখানেক আগে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়। রাজীবের বিরুদ্ধে গত বছর একটি যৌতুক মামলা করেছিলেন সুবর্ণা। মামলা নং-সিআর ২৯৭/১৭ (পাবনা)। মঙ্গলবার ওই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ছিল। এইদন সাক্ষ্য দেন সুবর্ণার বড় বোন চম্পা বেগম। সাক্ষ্য রাজীবের বিপক্ষে যাওয়ায় তাদের সঙ্গে আদালত প্রাঙ্গণে বাকবিতণ্ডা হয়। তারপর সুবর্ণা তার অফিসে যায় এবং রাতে কাজ শেষে বাড়ির গেটে ঢোকামাত্রই ৩/৪ জন দুর্বৃত্ত এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ফেলে রেখে চলে যায়। এ সময় স্থানীয়দের সহযোগিতায় সুবর্ণাকে উদ্ধার করে তার মা পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বড় বোন চম্পা বেগম বলেন, ‘মঙ্গলবার সকালে আমার বোনের যৌতুক মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ ছিল। আমার সাক্ষ্য আসামির বিপক্ষে যাওয়ায় রাজীব ও তার সহযোগীরা আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এক পর্যায়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। আমরা তখন সেখান থেকে বাড়িতে চলে আসি।’

বাড়ির কেয়ারটেকার ইমরান হোসেনের ছোট ভাই মেহেদি বলেন, ‘আমার ভাই এই বাড়ির কেয়ারটেকার। ঘটনার সময় আমার ভাই বাড়ি ছিলেন না। পরে খবর পেয়ে ভয়ে বাড়ি ফেরেন নাই। রাত আড়াইটার দিকে বাড়ি আসলে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে এবং সঙ্গে তার আরও কয়েকজন বন্ধুকে ধরেছে।’

আবুল হোসেনের মালিকানাধীন শিমলা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড হাসাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী বলেন, ‘রাতেই আমাদের মালিক আবুল হোসেনকে আটক করে থানায় নিয়ে গেছে পুলিশ।’

সুবর্ণা নদী আনন্দ টিভির পাশাপাশি স্থানীয় অনলাইন পোর্টাল দৈনিক জাগ্রতবাংলার সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন। রাজীবের সঙ্গে বিয়ের আগেও তার আরেকটি বিয়ে হয়েছিল। সেই ঘরে তার ৯ বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। সুবর্ণা নদী জেলার আটঘরিয়া উপজেলার একদন্ত গ্রামের মৃত আইয়ুব আলীর মেয়ে।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে পাবনা শহরের রাধানগর মজুমদারপাড়া এলাকায় সুবর্ণার ঘরে তাকে খুন করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। পৌর সদরের রাধানগর মহল্লায় আলীয়া মাদরাসার পশ্চিম পাশের একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন সুবর্ণা।

পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইবনে মিজান বলেন, বাসার কলিং বেল টিপে কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি তাকে ডেকে বের করে। সুবর্ণা নদী গেইট খোলার সাথে সাথে তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। স্থানীয়রা সুবর্ণাকে পাবনা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তিনি মারা যান।