লাইফস্টাইল

মুখে খাওয়ার ইনসুলিন, স্বপ্ন হবে সত্যি

আজিজ সাহেবের ডায়াবেটিস হয়েছে ৪০ পেরোতেই, তাকে নিয়মিত ইনসুলিন নিতে হয়। সেদিন এক বিয়ে বাড়িতে গিয়ে মনে হলো ইনসুলিন ইঞ্জেকশন নেয়া হয়নি। বিয়ে বাড়ির মজার মজার খাবারগুলো খাবেন কীভাবে, চিন্তায় পড়ে গেলেন।

যারা নিয়মিত ইনসুলিন নেন, তাদের অনেকেরই মাঝে মধ্যে এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। তবে এবারের বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসে আপনাদের জন্য সুখবর হচ্ছে, দ্রুতই বাজারে আসছে মুখে খাওয়ার ইনসুলিন।

দীর্ঘদিন গবেষকরা মুখে খাওয়ার ইনসুলিন নিয়ে গবেষণা করছেন। আর বিশ্বের ৪০ কোটি ডায়াবেটিস রোগী তাকিয়ে আছেন এই একটি আবিষ্কারের দিকে। কারণ সকাল বিকেল ইঞ্জেকশন নেয়া বিরক্তি ও হতাশা তৈরি হতে পারে রোগীর মধ্যে।

 সবার মনে একটাই প্রশ্ন কবে আসছে মুখে খাওয়ার ওরাল ইনসুলিন?

মুখে আমরা যত ধরনের ওষুধ গ্রহণ করি, তার বেশিরভাগই অতিক্ষুদ্র পরমাণু নিয়ে গঠিত, অন্যদিকে ইনসুলিন হলো একটি প্রোটিন যার গঠনও বেশ বড়, ফলে পাকস্থলীতে যাবার সঙ্গে সঙ্গে এটিকে অন্যান্য খাদ্য প্রোটিনের মতো মনে করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগে বিভক্ত করে দেয় যা এমাইনো এসিড নামে পরিচিত। ফলে ইনসুলিন মূল রক্তে গিয়ে কাজ শুরু করার পূর্বেই নষ্ট হয়ে যায়। আর এটিই বিজ্ঞানীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর এই অবস্থা এড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা কিছু পন্থা আবিষ্কার করছেন যাতে ইনসুলিন খাদ্যচক্রে না ভেঙে সরাসরি রক্তে প্রবেশ করে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা কমিয়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

মে ২০১৮ সালে নিউইউর্ক ভিত্তিক কোম্পানি “ওরামেড” ২৪০ জন রোগীর ওপর ৯০ দিনের পরীক্ষা চালিয়ে সফলতা পেয়েছেন। দেখা গেছে ২৮ দিনে প্রায় ১৮০ জন রোগীর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ওরামেড’র সিইও, বিজ্ঞানী নাদাভ কিডরন সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, বিষয়টি এমন নয় যে ইঞ্জেকশন ইনসুলিনের চেয়ে মুখে খাওয়ার ইনসুলিন এজন্য ভালো যে, এটিতে সুই ফুঁড়তে হয় না। বরং এর আরও অনেক ধরেনর উপকার রয়েছে। ইঞ্জেকশন ইন্সুলিন সরাসরি রক্তে চলে যায় যার ফলে অনেক বেশি গ্লুকোজ চর্বি ও মাংসপেশিতে জমা হয়, এতে করে মানুষের মুটিয়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা হয়। কিন্তু ওরাল ইনসুলিন সরাসরি রক্তে না গিয়ে লিভারে সংরক্ষিত হবে এবং শুধু প্রয়োজনমতো ইনসুলিন রক্তে ছেড়ে দেবে। ফলে মুটিয়ে যাওয়ার এবং ইঞ্জেকশন ইনসুলিনের মতো হাইপোগ্লাইসেমিক ( গ্লুকোজ কমে যাওয়া)র কোনো ঝুঁকিও থাকবে না।

কারো ডায়াবেটিস ধরা পড়লে একেবারে শুরু থেকেই চিকিৎসক মুখে খাওয়ার ইনসুলিন দিয়ে চিকিৎসা করতে পারবেন।

এরইমধ্যে ওরামেড ওরাল ইনসুলিন বাজারে আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা ফুড এন্ড ড্রাগ অথারেটির অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু ইতিমধ্যে হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা তাদের সতর্ক করে দিয়েছেন, কেননা এর আগে ইনহেলার হিসেবে ইনসুলিন মার্কেটে আনা হয়েছিল এবং সেটির কার্যকারিতা খুব বেশি না হওয়ার মার্কেট থেকে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছিলো সানোফি নামের অন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠান।

তবে এবার বিজ্ঞানীরা খুব বেশি আশাবাদী, সেই সঙ্গে আশাবাদী বিশ্বের সব ডায়াবেটিস রোগীও। আজ বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসে সবাইকে ডায়াবেটিস নিয়ে আরও বেশি জানা বোঝার আহ্বান জানাই।

লেখক: ডা. শরীফ মহিউদ্দিন
ডায়াবেটিক চিকিৎসক ও গবেষক
রিসার্চ ফেলো, আইচি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান