লাইফস্টাইল

মাদকের চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে পরকীয়া

প্রেম ও পরকীয়ার ঘটনা মাদক আসক্তির চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ছে পরকীয়া প্রেমিক-প্রেমিকারা। ভেঙ্গে যাচ্ছে সংসার ও রঙিন স্বপ্ন। স্থানীয় জনতা ও পুলিশের হাতে আটক পরকীয়া জুটির জবানবন্দীতে বেরিয়ে এসেছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য ও মর্মান্তিক কাহিনী। এসব ঘটনার কোন তদন্তই হয় না। সামাজিক মধ্যস্থতায় কয়েকজন সংসারে ফিরে গেলেও সিংহভাগ হারিয়েছে সংসার। অনেকেই বেছে নিয়েছে আত্মহত্যার পথ।

যেভাবে পরকীয়া প্রেমের সৃষ্টি হয় তার অনেক ঘটনা বের হয়ে এসেছে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় আটক পরকীয়া জুটির জবানবন্দী থেকে। সংসারে স্বামী বা স্ত্রীর অনুপস্থিতি, অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, নিজেকে নিঃসঙ্গ ভেবে পরকীয়ায় সমর্পণ। সামান্য পরিচয়ের সূত্র ধরে সম্পর্ক তৈরি ও নিজেকে সিঙ্গেল দাবি করে ছেলেমেয়েরা বিয়ের প্রলোভনে অনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করছে। বিশেষ করে ফেসবুক ও মোবাইল পরকীয়া করাকে খুবই সহজ করে দিয়েছে। জীবনসঙ্গীর চোখের আড়ালে সুযোগ বুঝে নিজেকে সিঙ্গেল পরিচয় দিয়ে পরকীয়া করেন অনেকে।

সমাজ সচেতনতা নিয়ে কাজ করেন মেহেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি একেএম শফিকুল আলম। পরকীয়া প্রেম ও অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক বিপ্লবের সাথে সাথে নারীর ক্ষমতায়নও হয়েছে। কিন্তু নারীর দায়িত্ববোধ বাড়েনি। ভেঙ্গে পড়েছে পারিবারিক শাসন ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। অপরদিকে অপসংস্কৃতি বিশেষ করে ভারতীয় টিভি সিরিয়ালে নারী নেতৃত্বে কুটনামির গল্প ও সংসারে আগুন জ্বালানোর মন্ত্র আমাদের সমাজের নারীদের মনোজগতে একটি নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করছে। অপরদিকে স্বামী বিদেশ থাকার কারণে সংসারে নারীর আধিপত্য বেড়েছে। এতে পারিবারিক বন্ধন ও নিয়ন্ত্রণও নারীর প্রতি কমে যাচ্ছে।

একইভাবে নারী নির্যাতন আইনের অপপ্রয়োগকেও দায়ী করলেন এই বিশিষ্ট আইনজীবী। তিনি বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মিথ্যা মামলায় স্বামী ও বা পুরুষকে ফাঁসানো হচ্ছে। অপরদিকে নারীরাও নির্যাতনের শিকার হয়।

জানা গেছে, ৯ জুলাই বাহাগুন্দা গ্রামের রাফিজুল ওরফে লাল মিয়া এক কলেজছাত্রীর সঙ্গে অসামাজিক কাজে লিপ্ত অবস্থায় জনগণ দুজনকে তাড়া করে। এসময় রাফিজুল পালিয়ে গেলেও ধারা পড়ে  যায় রাফিজুলের বোন ও প্রেমিকা। বিবাহিত হয়েও রাফিজুল নিজেকে অবিবাহিত পরিচয় দিয়ে মোবাইল ফোনে সম্পর্ক গড়ে তোলে। একই দিনে চরগোয়াল গ্রামের দুই সন্তানের জননী লাবনী খাতুন বিয়ের দাবিতে পরকীয়া প্রেমিক দুই সন্তানের জনক জিনারুলের বাড়িতে অনশন শুরু করে। পরদিন বিকেলে তাদের দুজনের বিয়ে হয় সামাজিকভাবে।

অপরদিকে স্ত্রীর পরকীয়া সইতে না পেরে ১০ জুলাই হিজলবাড়ীয়া গ্রামের লাল্টু মিয়া (২৫) নামের এক যুবক বিষপানে আত্মহত্যা করে। স্ত্রী সুমি অন্য পুরুষের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে লাল্টু মিয়া এই পথ বেছে নেয় বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।

একই দিনে নিজেকে অবিবাহিত পরিচয় দিয়ে শহড়াবাড়িয়ার ঠান্ডুর ছেলে স্বপন পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে তোলে কড়ইগাছি গ্রামের সালমার সাথে। অনৈতিক কাজের দায়ে তাদেরকে গত বুধবার বিকেলে স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশে দেয়। স্বপনের ঘরে রয়েছে স্ত্রী ও দুই সন্তান।

১১ জুলাই শ্যালকের প্রেমিকার সাথে অনৈতিক কাজের লিপ্ত থাকার অভিযোগে করমদি গ্রামের আশরাফুল নামের একজনকে আটক করে পুলিশ। আশাদুলের সংসারে রয়েছে স্ত্রী কনা ও ছেলে সাব্বির। এ ঘটনায় আশরাফুল ও তার শ্যালকের নামে অপহরণ পূর্বক ধর্ষণ মামলা দায়ের করে ওই ছাত্রীর পরিবার।

গত ১৯ জুন পরকীয়ায় বাধা দেয়ায় স্বামীর নির্যাতন সইতে হয় দেবীপুর গ্রামের গৃহবধূ ফরিদাকে। এক পর্যায়ে ফরদা আত্মহত্যা করে। ১১ জুন গাংনীর ভিটেপাড়া মাঠে একটি লিচু বাগানে ফুর্তি করতে গিয়ে জনতার হাতে গণধোলাই খেয়েছে প্রাক্তন প্রেমিক জুটি হিন্দা গ্রামের সেন্টু ও কুলবাড়িয়া গ্রামের এক সেবিকা। সেন্টু বিবাহিত হলেও নিজেকে অবিবাহিত পরিচয় দিয়ে ওই সেবিকার সাথে সম্পর্ক তৈরি করে।

বিয়েতে প্রেমিকার পরিবার অমত থাকায় বিষপান করে এক প্রেমিক যুগল। তবে সৌভাগ্যক্রমে প্রেমিকা প্রাণে বেঁচে গেলেও মৃত্যু বরণ করে হতভাগা প্রেমিক। ঘটনাটি ঘটে গাংনী উপজেলার কাজিপুর গ্রামে। হতভাগা প্রেমিকের নাম সাদ্দাম হোসেন (২৩)। তিনি কাজিপুর গ্রামের মৃত ছাদিমান হোসেনের ছেলে।

৩০ জুন মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার হিজলবাড়িয়া গ্রামে অসামাজিক কাজে লিপ্ত অবস্থায় গ্রামবাসী করমদি বহলপাড়ার এলাহী বক্সের ছেলে শিপন মিয়া (২৬) ও কল্যাণপুর গ্রামের মাসুদ রানার মেয়ে সুরভী আক্তার মালাকে আটক করে পুলিশে দেয়।

স্বামী বাইরে থাকায় স্ত্রী মালা পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছে বলে জানায়। স্থানীয় পর্যায়ে সালিশ করে মালা স্বামী সংসারে ফিরে গেলেও শিপন মিয়াকে তার স্ত্রী ছেড়ে চলে যায়। এমনই ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে জেলার বিভিন্ন স্থানে। কোনটি পুলিশ পর্যন্ত গড়াচ্ছে আবার কোনটি পারিবারিকভাবেই চেপে যাওয়া হচ্ছে।

গাংনী মহিলা ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগীয় প্রভাষক রমজান আলী বলেন, মানুষের নীতি-নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ নষ্ট হওয়ার কারণে পরকীয়া বৃদ্ধি পাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে আত্মীয়তার সম্পর্ক। অপসংস্কৃতি চর্চায় মানুষের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে স্বামী-স্ত্রীরা বিদ্যমান সম্পর্কের বাইরে গিয়ে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্কে তৈরি করছে।

মেহেরপুর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি সবাইকে ভাবাচ্ছে। এ বিষয়ে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।