জাতীয়

মনোনয়ন নিয়ে বড় দুই দলেই জটিলতা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মাঠ গোছাতে নেমে পড়েছেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপে ক্রমেই সরগরম হয়ে উঠছে নির্বাচনী এলাকা।

জোট শরিকের পাশাপাশি দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের মনোনয়ন প্রত্যাশার কারণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে এ নিয়ে জটিলতা রয়েছে। বিগত দুটি নির্বাচনে দলটির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রার্থী মনোনয়ন দিলেও এবার দল থেকে প্রার্থী আশা করছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা।

অন্যদিকে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপিরও একাধিক নেতা নির্বাচন করতে চান। তবে দলের নেতারা বলছেন, তাঁদের প্রার্থী ঠিক করা আছে।

এ আসনে বিগত দুটি সংসদ নির্বাচনে জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা মইন উদ্দীন খান বাদল নৌকা প্রতীকে বিজয়ী হন।

চট্টগ্রাম-৮ নির্বাচনী এলাকাটি কর্ণফুলী নদীর দুই পারের গ্রাম ও নগরের অংশ নিয়ে গঠিত। শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়ন ছাড়া বোয়ালখালী উপজেলা, নগরের চান্দগাঁও থানার পুরোটা এবং পাঁচলাইশ ও বায়েজিদ বোস্তামী থানার আংশিক (চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত) এ নির্বাচনী এলাকার অন্তর্ভুক্ত। এ আসনে ভোটারসংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। এর মধ্যে বোয়ালখালী উপজেলার ভোটারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ভোটার রয়েছে সিটি করপোরেশনের পাঁচটি ওয়ার্ডে।

উল্লেখ্য, এ আসন থেকে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের মো. কফিল উদ্দিন সংসদ সদস্য হন। ১৯৭৯ সালে নির্বাচিত হন বিএনপির সিরাজুল ইসলাম। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে এবং ১৯৯১, ’৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপি থেকে এম মোরশেদ খান সংসদ সদস্য হন। ১৯৮৮ সালে জয়লাভ করেন জাতীয় পার্টির কামরুন নাহার জাফর।

আওয়ামী লীগ : প্রায় তিন দশক পর ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন মহাজোটের প্রার্থী জাসদের কার্যকরী কমিটির সভাপতি মইন উদ্দীন খান বাদল নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি আবারও নির্বাচিত হন। দীর্ঘদিন পর জোট প্রার্থীর হাত ধরে আসনটি ফিরে পায় আওয়ামী লীগ। এর পর থেকেই বোয়ালখালী উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। দলের উপজেলা শাখা দুই ভাগে বিভক্ত। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের দুই শীর্ষ নেতার অনুসারীরা পৃথকভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন করে। এ ছাড়া প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করা বাদলকে ঘায়েল করতে অন্যান্য উপজেলার চেয়ে বোয়ালখালীতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি বলে সভা-সমাবেশে দাবি করে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দীন আহমদ ও তাঁর অনুসারীরা। বিভক্ত আওয়ামী লীগের এক নেতা এস এম আবুল কালাম বর্তমানে কুয়েতের রাষ্ট্রদূত। তাঁর অনুসারীদের একাংশ স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও বড় একটি অংশ নিষ্ক্রিয়। তবে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে বোয়ালখালীতে মোসলেম উদ্দিন আহমদের অবস্থান অনেক সুদৃঢ় বলে অভিমত স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের।

এবারও আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা দলীয় মনোনয়ন চান। তাঁরা হলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন আহমদ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম রেজাউল করিম চৌধুরী ও দক্ষিণ জেলা শাখার তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আবদুল কাদের সুজন, নগর শাখার সহসভাপতি ও মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির ছেলে তরুণ শিল্পপতি ও শিক্ষানুরাগী মুজিবুর রহমান।

বর্তমান সংসদ সদস্য মউন উদ্দীন বাদলও আবার মনোনয়ন চান।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নৌকা প্রতীকে ভোট চেয়ে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন মোসলেম উদ্দিন আহমদ।

নৌকা প্রতীক উন্নয়নের প্রতীক—এ মন্তব্য করে মোসলেম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সারা দেশের সঙ্গে চট্টগ্রামেও যে ধারাবাহিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চলছে সেই বিবেচনায় জনগণ আগামী দিনেও নৌকা প্রতীকে ভোট দেবে বলে তিনি আশাবাদী। তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজে স্নাতক (অনার্স) কোর্স চালু, কর্ণফুলী নদীর ভাঙন রোধে বিশেষ ব্যবস্থা, বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু নির্মাণের সব প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন শুধু দৃশ্যমান তৎপরতার অপেক্ষায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের হাত ধরেই চট্টগ্রামে যানজট নিরসনে একাধিক ফ্লাইওভার, কর্ণফুলীর উত্তর তীরে শহর রক্ষা বাঁধ তথা রিং রোড প্রকল্প এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার বিশাল কার্যক্রমসহ চট্টগ্রাম উন্নয়নের একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক ছালাম ২০০৮ নির্বাচনে চট্টগ্রামের এ আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তিনি এবারও চট্টগ্রামের এ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে তাঁর অনুসারীরা জানিয়েছে।

মনোনয়ন প্রসঙ্গে আবদুচ ছালাম কালের কণ্ঠেকে বলেন, ‘গত দুই নির্বাচনেও দলের প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়ন চেয়েছিলাম। কিন্তু মহাজোটের স্বার্থে সভানেত্রীর সিদ্ধান্ত আমি মেনে নিই এবং দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করি। এবারও মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি। তবে এ ক্ষেত্রে সভানেত্রীর সিদ্ধান্ত মেনে নেব।’

সংসদ সদস্য মইন উদ্দীন খান বাদল বলেন, ‘জোটের শরিক দল হিসেবে এ আসনের প্রার্থী আমি। আওয়ামী লীগ যদি একক নির্বাচন করে, তাহলে ভিন্ন কথা।’

তাঁর নির্বাচনী এলাকার চান্দগাঁওয়ে ১০০ একর জায়গা নিয়ে একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় করা হচ্ছে জানিয়ে বাদল বলেন, ‘আমাদের বিশাল সমুদ্র এলাকায় যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, যাকে আমরা ব্লু ইকোনমি বলছি সে বিষয়ে পাঠদানের জন্য বঙ্গবন্ধু মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় নামে এই বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম চলছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক সহযোগিতায় বিশেষায়িত এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলছে।’ এ ছাড়া তিনি ২০০৮ সালের পর থেকে এ নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরেন।

রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সুদিন-দুর্দিনে রাজনীতির মাঠে আছি। বঙ্গবন্ধুকন্যা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা যদি আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করে যোগ্য মনে করেন এবং এ আসনের জন্য মনোনয়ন দেন, তাহলে আমি নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুত।’

আবদুল কাদের সুজন বলেন, ‘আমি তৃণমূল থেকে উঠে আসা আওয়ামী লীগের একজন কর্মী। নির্বাচন করার আগ্রহ আমারও রয়েছে।’

বিএনপি : দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি নেতারা জানান, সরকারের দমন-পীড়নের কারণে তাঁদের দলীয় কর্মকাণ্ড আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। তবে এ আসনে ভোটের রাজনীতিতে দলটি দুর্বল নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদে বোয়ালখালী উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান জয়ী হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে পৌরসভা নির্বাচনে জয়ী হওয়া তারই প্রমাণ বলে মনে করেন দলটির নেতারা।

এক দশক পর হারানো এ আসন পুনরুদ্ধারে বিএনপির নেতাকর্মীরা এবার মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা বলছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে নৌকার কাছে পরাজিত হয়েছিলেন ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এরশাদ উল্লাহ। অবশ্য এ পরাজয়ের জন্য বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খানকে দায়ী করে এরশাদ উল্লাহ ও তাঁর অনুসারীরা। এ বিরোধে বিভক্ত হয়ে পড়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা। তবে খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর পর দীর্ঘদিনের বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দলীয় কর্মসূচি পালন করছে নেতাকর্মীরা।

আগামী নির্বাচনে বিএনপির ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খানসহ দলের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন।

তবে মোরশেদ খানকেই ধানের শীষ প্রতীকের একক প্রার্থী হিসেবে দেখতে আগ্রহী বিএনপির স্থানীয় নেতারা। সাম্প্রতিক সময়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে আয়োজিত সভা-সমাবেশে মোরশেদ খানের জন্য ভোট প্রার্থনা করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।

মামলার কারণে যদি মোরশেদ খান নির্বাচনে অংশ  নিতে না পারেন সে ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক কে এম ফেরদৌসের নাম শোনা যাচ্ছে।

আবু সুফিয়ান বলেন, ‘যাঁরা রাজনীতি করেন তাঁদের প্রত্যেকের লক্ষ্য থাকে সংসদ সদস্য হওয়ার। আমারও লক্ষ্য আছে। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দলের সঙ্গে আছি এবং এ এলাকার মানুষের সঙ্গেই আছি। দলের নীতিনির্ধারক মহল যদি আমাকে যোগ্য মনে করে মনোনয়ন দেয়, তাহলে নির্বাচন করব।’

এরশাদ উল্লাহ বলেন, ‘দলীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। ২০০৮ সালে দলের চরম দুঃসময়ে নির্বাচন করেছিলাম। এবার মনোনয়ন দিলে করব। মনোনয়ন তো আর আমার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না।’