জাতীয়

বিমানবন্দর সড়কে এসে চোখের সামনে বাসটি উঠে গেল ছেলে-মেয়েগুলোর ওপর !

মাটিকাটা ফ্লাইওভারের যে প্রান্ত দিয়ে গাড়িগুলো বিমানবন্দর সড়কে এসে নামে, তার বামপাশে কিছু ছেলে-মেয়ে প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকে বাসের অপেক্ষায়। এমন জায়গায় বাসে ওঠা ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ; কারণ ফ্লাইওভার থেকে নামার সময় প্রচণ্ড গতিতে আসতে থাকে বাসগুলো। তারপরেও এসব শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনই দাঁড়িয়ে থাকে; বাসচালকরাও বাস থামিয়ে তাদের তুলে নেয়। আজও এমনটাই হতে যাচ্ছিল। কিন্তু বিধি বাম! 

আমি ছিলাম মিরপুর থেকে বাড্ডাগামী জাবালে নূরের একটি বাসে। শিক্ষার্থীরা হাত তোলার পর বাসটি থেমে যায় ফ্লাইওভারের ঠিক মাথায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমাদের বাসটির বামদিকে পেছনে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দেয় মিরপুর থেকে আবদুল্লাহপুরগমী জাবালে নূর বাসটি। প্রচণ্ড সংঘর্ষে ধোঁয়া উড়তে থাকে। বাসের ভেতরে আমরা কিছু বুঝে না উঠতেই পেছনের বাসটি আরও বামদিকে ঘুরে গিয়ে সোজা ছেলে-মেয়েগুলোর ওপর উঠে পড়ে! আতঙ্কিত যাত্রীরা জানালা দিয়ে লাফিয়ে নামতে শুরু করে দেয়। তখনও প্রায় সবাই বুঝতে পারেনি কী ভয়ানক ঘটনা ঘটে গেছে! 

ততক্ষণে কানে আসে আর্তচিৎকার। বাস থেকে নেমে দেখি আবদুল্লাহপুরগামী জাবালে নূর বাসটির নিচে চাপা পড়ে আছে কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাদের বের করার চেষ্টা করছে বাসযাত্রী এবং অন্যান্য শিক্ষার্থীরা। আহত কয়েকজনকে পাঁজাকোলে করে গাড়ি ডাকছিল কয়েকজন। সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসে একাধিক প্রাইভেট গাড়ি। এদিকে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল ঘটনাস্থল। একটি ছেলে চাপা পড়েছিল বাসটির চাকার নিচে। তাকে বের করতে সবাই মিলে ভারী বাসটিকে ঠেলতে শুরু করে! 

গুরুতর আহত একটি মেয়েকে বের করে আনে পথচারীরা। একজন চিৎকার করে বলছিল, ‘বেঁচে আছে, বেঁচে আছে…. হাসাপাতালে নিয়ে যান।’ একটি কারে ওঠানো হয় মেয়েটিকে। এদিকে খবর পেয়ে দলে দলে ছুটে আসছে ছাত্র-ছাত্রীরা। হাহাকার-বিলাপ-আহতদের আর্তচিৎকারের মাঝে ছাত্র-পথচারীদের অন্য একটি দল বাসের হেল্পারকে ধরে প্রহার করছিল। চালক ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই পালিয়ে গেছে। বয়স্ক একজন কপাল চাপড়ে বলছিলেন, ‘হায় আল্লাহ, কী ভাগ্য নিয়া এই দেশে থাকি…!’ 

এরপর আরও অনেক কিছু ঘটে গেছে…। বাস পোড়ানো হয়েছে। রাস্তা অবরোধ করেছে বিক্ষুব্ধ ছেলে-মেয়েরা। মিডিয়ায় নিউজ হয়েছে। খুব পরিচিত এই ঘটনাগুলো। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটে। প্রতিবাদ হয়, কিন্তু প্রতিকার হয়না। হবে কীভাবে? এখন পর্যন্ত একটি সড়ক দূর্ঘটনার দায়ে কোনো চালক তো সাজা পায়নি! 

বাংলাদেশের বাসচালকদের ৯৫ ভাগই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালান। দিনে দুপুরে বাসের ফাঁকা বাসে বসেই তারা নেশাদ্রব্য সেবন করে গাড়ি চালান। এর মূল্য দিতে হয় জনগনক। কুর্মিটোলায় আজ যে দুটি ছেলে-মেয়ের জীবনপ্রদীপ নিভে গেল, তার দায় এই বাসচালকেররা অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু খুব সহজেই আইনের হাত থেকে পার পেয়ে যায় তারা। আবারও তারা নেশা করে গাড়ি চালায়; আবারও কোনো মায়ের কোল খালি হয়ে যায়। 

ভয়ানক ওই দুর্ঘটনা দেখে আরকটি বাসে করে গন্তব্যে যাচ্ছিলাম। দুর্ঘটনাকবলিত বাসদুটির যাত্রীও ছিল তাতে। আলোচনা চলছিল দুর্ঘটনা নিয়ে। যাত্রীরা প্রকাশ করছিলেন অসহায়ত্ব। এর মধ্যেই আরেকটি বাসের সঙ্গে পাল্লা দিতে থাকে আমাদের বহনকারী বাসটি! একে অন্যের গা ঘেষে এগিয়ে যেতে থাকে! যাত্রীরা চিৎকার-গালাগালি শুরু করলে রেষারেষি থামিয়ে দেয় আমাদের চালক। 

কিন্তু জানেন, রাজধানীতে এভাবেই প্রতিদিন বাসচালকেরা রেষারেষিতে নামে। আর যাত্রীরা গালাগাল করতে করতে গন্তব্যে যায়। কিছু ক্ষেত্রে বাসের নেশাগ্রস্ত চালক-হেলাপাররা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে যাত্রীদের ওপর। প্রতিবাদী যাত্রীরা হয়তো থেমে যায়; কিন্তু সড়কে মৃত্যুর মিছিল চলতেই থাকে…। এখনই ব্যবস্থা না নিলে এই মিছিল চলতেই থাকবে….চালকদের হাতে জিম্মি হয়েই থাকবে সারা দেশ।