রাজনীতি

বারবার আসতে পারব না যত ইচ্ছা সাজা দেন

‘আদালত যা ইচ্ছা তাই সাজা দিতে পারেন। যত ইচ্ছা সাজা দিতে পারেন। আমি অসুস্থ। আমি বারবার আদালতে হাজির হতে পারব না।’ গতকাল বুধবার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার শুনানির সময় খালেদা জিয়া বিচারককে উদ্দেশ করে এ কথা বলেন।

এই মামলায় গতকাল আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানির দিন ধার্য ছিল। আগের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয়ের জারি করা কারাগারের ভেতরে এই আদালত বসার প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী খালেদা জিয়া  সেখানে আসেন। কারাগারের প্রধান ফটকের পাশে দোতলা একটি ভবনের নিচতলায় এই অস্থায়ী আদালত স্থাপন করা হয়েছে।

ঢাকার বিশেষ আদালত-৫-এর এই অস্থায়ী আদালতে বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান আসেন সকাল ১১টার দিকে। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করা হয়। তাঁকে একটি হুইলচেয়ারে করে আদালতে আনা হয়। খালেদা জিয়ার পরনে ছিল বেগুনি রঙের শাড়ি। তিনি হুইলচেয়ারে বসা থাকা অবস্থায় তাঁর পায়ের ওপরের অংশ থেকে নিচ পর্যন্ত একটি সাদা চাদরে ঢাকা ছিল। তবে গতকাল শুনানিতে খালেদা জিয়ার পক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।

খালেদা জিয়াকে হাজির করার পর ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি বিএনপি নেতা গোলাম মোস্তফা খান  আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি খালেদা জিয়ার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলেন। পরে আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে গোলাম মোস্তফা খান আদালতকে বলেন, তিনি ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে আদালতে এসেছেন। কিন্তু এসে আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে কোনো সিনিয়র আইনজীবীকে দেখছেন না। মোস্তফা খান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী কারাগারে আদালত বসবে এই প্রজ্ঞাপন গতকাল জারি করা হয়েছে। বিষয়টি যথাযথভাবে আসামিপক্ষকে জানানো হয়নি। তাই সার্বিক বিবেচনায় একটা নতুন তারিখ ধার্য করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

আদালত বলেন, মামলার তারিখ তো আগেই ধার্য করা ছিল। আইনজীবীরা আসবেন না কেন। জবাবে গোলাম মোস্তফা খান বলেন, এখানে মামলার কথা তাঁরা জানেন না। তিনি আরো বলেন, ‘আদালতে ঢোকার সময় ফোন বাইরে রেখে দেওয়া হয়েছে। কাউকে জানানোরও উপায় নেই।’ আদালত বলেন, তারিখ পেছাতে হলে আসামিদের কাউকে না কাউকে সময়ের আবেদন তো করতে হবে।

ওই সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতকে বলেন, এ মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য ছিল। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হয়। এরপর থেকে অসুস্থতার কারণে খালেদা জিয়াকে এখন পর্যন্ত আদালতে হাজির করা যায়নি। তাঁর অসুস্থতা ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কারাগারে আদালত বসানোর বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এ বিষয়ে যথাযথভাবে আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়াকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। আর অন্য আইনজীবীদের ব্যক্তিগতভাবে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে রাজধানীর বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের প্যারেড মাঠে স্থাপিত অস্থায়ী আদালত যেখানে বসত সেখানেও তা টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর তিনি আদালতের কার্যক্রম শুরুর আবেদন জানান। পরে বিচারক খালেদা জিয়ার জামিন বহাল রেখে আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন।

এর আগে খালেদা জিয়া আদালতকে বলেন, ‘এই আদালতে ন্যায়বিচার নেই। অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ন্যায়বিচার করা হয়নি। আদালত যা ইচ্ছা তাই সাজা দিতে পারেন। যত ইচ্ছা সাজা দিতে পারেন। আমি অসুস্থ। আমি বারবার আদালতে হাজির হতে পারব না। আমার সিনিয়র আইনজীবীরা আসেননি। এটা জানলে আমি আসতাম না।’ খালেদা জিয়া বলেন, ‘ডাক্তার বলেছেন পা ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। হুইল চেয়ারে বসে থাকলে পা ঝুলিয়ে রাখতে হয়। এতে পা ফুলে যাবে।’

আদালতের কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর খালেদা জিয়াকে নেওয়ার সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার কোনো সিনিয়র আইনজীবী আদালতে ছিলেন না। এখানে আদালত বসবে তাঁদের এটা জানানো হয়নি। যে প্রজ্ঞাপন গতকাল জারি করা হয়েছে তা কেন সাত দিন আগে জানানো হয়নি?’  তিনি আরো বলেন, ‘আমি আদালতকে জানিয়েছি অসুস্থতার কথা। বারবার আসতে পারব না তাও বলেছি।’

সংবিধান মেনেই পুরনো কারাগারে অস্থায়ী আদালত : অ্যাটর্নি জেনারেল

বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সংবিধান মেনেই পুরনো কারাগারে অস্থায়ী আদালত স্থাপন করা হয়েছে। গতকাল বুধবার বিকেলে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, কারগারে আদালত স্থানান্তর করায় সংবিধান লঙ্ঘন হয়নি। নিরাপত্তাজনিত কারণেই পুরনো কারাগারে অস্থায়ী আদালত স্থাপন করা হয়েছে।

যেখানে অস্থায়ী আদালত : নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকের পাশেই একটি দোতলা ভবন। এই ভবনের নিচতলায়  প্রায় ৭০ হাতের মতো লম্বা ও ৩০ হাতের মতো চওড়া একটি বিশাল কক্ষ। কক্ষের মেঝেতে নীল রঙের কার্পেট বিছানো। বেশ কয়েকটি ফ্যান আছে। এজলাস, পেশকার ও কর্মচারীদের চেয়ার-টেবিল, আইনজীবীদের জন্য বসার স্থান, এমনকি সাংবাদিকদের জন্য বসার জায়গা রাখা হয়েছে। আসামি ও সাক্ষীদের জন্য পৃথক কাঠগড়াও রয়েছে। বোঝাই যায়, আগে থেকেই অস্থায়ী আদালত বসানোর কাজ চলছে। কিন্তু প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে গত বুধবার।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন একই আদালত। এরপর থেকে খালেদা জিয়া নাজিম উদ্দিন রোডের এই পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন। ওই মামলার রায় ঘোষণার আগেই জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি চলছিল। কিন্তু রায় ঘোষণার পর আর খালেদা জিয়াকে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আদালতে হাজির করা যায়নি। নির্ধারিত তারিখে হাজির না হওয়ায় মামলার শুনানিও বারবার পেছাতে হয়েছে। এ কারণেই কারাগারেই নতুন অস্থায়ী আদালত স্থাপন করা হয়।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক হারুন-অর-রশীদ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।