শিক্ষাঙ্গন

বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা

ঝর্ণা তার দাদুর সঙ্গে অতীতের অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে থাকে। তার দাদু তাকে জানান, এমন একসময় ছিল যখন বাংলার মুসলমানদের প্রভাব, রীতিনীতি ও ভাবধারা হিন্দু সমাজে অনুপ্রবেশ করেছিল। তবু হিন্দু সমাজের মূল নীতিগুলো এবং সাধারণ সমাজব্যবস্থায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। ওই সময় বর্ণ প্রথা কঠোরভাবে পালিত হতো। ফলে এক বর্ণের সঙ্গে অন্য বর্ণের বিয়ে বা আদান-প্রদান নিষিদ্ধ ছিল।

ক) কোন যুগের প্রথম দিকে চারিত্রিক গুণাবলি ও সততার জন্য মুসলমানরা বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিল?

খ) মধ্য যুগের মুসলমানদের খাদ্যাভ্যাসের ব্যাখ্যা দাও।

গ) উদ্দীপকে যে সময়ের হিন্দু সমাজের সামাজিক জীবনের প্রতিচ্ছবি প্রকাশিত হয়েছে তার ব্যাখ্যা দাও।

ঘ) উক্ত সময়ে হিন্দু নারীদের তেমন কোনো অধিকার ছিল না—বিশ্লেষণ করো।

উত্তর : ক) মধ্য যুগের প্রথম দিকে চারিত্রিক গুণাবলি ও সততার জন্য মুসলমানরা বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিল।

খ) মধ্য যুগের মুসলমানদের খাদ্যাভ্যাস ছিল বৈচিত্র্যময়। তাদের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন মাছ-মাংসের সঙ্গে আচারের নামও পাওয়া যায়। এসব খাবারের পাশাপাশি কাবাব, রেজালা, কুর্মা আর ঘিয়ে রান্না করা সব মুখরোচক খাবার জায়গা করে নেয়। ভাত, মাছ, শাকসবজি বাঙালি মুসলমানদের প্রতিদিনের খাদ্য ছিল। খাদ্য হিসেবে রুটির ব্যবহারের কথা জানা যায়। খিচুড়ি তখনকার সমাজে একটি প্রিয় খাদ্য ছিল।

গ) উদ্দীপকের ঝর্ণা ও তার দাদুর কথোপকথনের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে হিন্দু সমাজের মূলনীতি। ওই সময়কার হিন্দু সমাজে বর্ণ প্রথা প্রচলিত ছিল। বর্ণ প্রথা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হতো। ফলে এক বর্ণের সঙ্গে অন্য বর্ণের বিয়ে বা আদান-প্রদান নিষিদ্ধ ছিল। পাঠ্য বইয়ে উদ্দীপকের ঝর্ণা ও তার দাদুর কথোপকথনের প্রতিরূপ পাওয়া যায়। উদ্দীপকের মতো মধ্য যুগের হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথা প্রচলিত ছিল এবং এক বর্ণের সঙ্গে অন্য বর্ণের বিয়ে আদান-প্রদান সম্পূর্ণ নিষেধ ছিল। অতএব এটা নিশ্চিত যে, ঝর্ণা ও তার দাদুর কথোপকথনে মধ্য যুগের হিন্দু সমাজের চিত্র ফুটে উঠেছে। নিচে পাঠ্য বই অনুসরণে মধ্য যুগের হিন্দু সমাজের সামাজিক জীবনচিত্র অঙ্কিত হলো—

ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈশ্য ও শূদ্র মধ্য যুগের হিন্দু সমাজে এ চারটি উল্লেখযোগ্য বর্ণ ছিল। ধর্ম-কর্মের ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণদের একক কর্তৃত্ব ছিল। কায়স্থরা ছিল হিন্দু সমাজের মধ্যম শ্রেণির অন্তর্গত। শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে তারা ছিল উল্লেখযোগ্য। কৃষিকাজ ছিল বৈশ্যদের প্রধান পেশা। তাদের মধ্যে অনেকে ব্যবসাও করত। সমাজের নিচুতম স্থানে ছিল শূদ্ররা। পেশাগত কারণে তারা পৃথক পৃথক শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যেমন—গোপা, গোয়ালা, তেলি, কামার, কুম্ভকার, তাম্বুলি, মালি, নাপিত, মুদ্রক, গল্প বণিক, শঙ্খবণিক, সুবর্ণবণিক, ছুতার, ধোপা, চামার ইত্যাদি। সমাজে দাসব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।

ঘ) ‘উক্ত সময়ে হিন্দু নারীদের তেমন কোনো অধিকার ছিল না’—উদ্দীপকের ঝর্ণা যে সময়ের কথা তার দাদুর সঙ্গে আলোচনা করেছে সে সময় মুসলমানদের প্রভাব, প্রতিপত্তি, ভাবধারা হিন্দু সমাজে প্রবেশ করেছিল। তবু হিন্দু সমাজের মূলনীতিগুলোর কোনো পরিবর্তন আসেনি। ওই সময় বর্ণ প্রথা কঠোরভাবে পালিত হতো। আমরা পাঠ্য বইয়ে মধ্য যুগের হিন্দু সমাজে উদ্দীপকের ঝর্ণার অনুরূপ চিত্র পাই। মধ্য যুগের বাংলার হিন্দু সমাজে নারীদের তেমন অধিকার ছিল না। স্বামী স্ত্রীকে তার সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করত। কন্যা, মাতা-পিতা, স্ত্রী-স্বামী ও বিধবা সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। গৃহকর্তার অনুমতি ছাড়া মেয়েরা গৃহের বাইরে যেতে পারত না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পত্তির ওপর স্ত্রীদের কোনো অধিকার ছিল না। সমাজে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। তবে বাংলায় সর্বত্র এ প্রথা বাধ্যতামূলক সামাজিক নীতি ছিল না। তবু এ যুগের অনেক নারী নিজ যোগ্যতা ও বুদ্ধিমত্তা দ্বারা নিজেদের স্বাধীন সত্তাকে বিকশিত করতে সমর্থ হয়েছিল।

অষ্টম অধ্যায়

উদ্দীপক : অর্পা টিভিতে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির বাংলাদেশ বনাম ভারতের সেমিফাইনাল ম্যাচ দেখছিল। তার বাবা বললেন, যে দেশে খেলাটি হচ্ছে এই দেশের এক দল বণিক রানির কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বাণিজ্য করতে উপমহাদেশে এসে কালক্রমে কম্পানিটি নিজেদের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

ক) পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হয় কখন?

খ) সূর্যান্ত আইন বলতে কী বোঝায়?

গ) উদ্দীপকে অর্পার বাবা কোন দেশের কম্পানি তথা বণিকদের কথা বলছিলেন—উল্লেখ করো।

ঘ) অর্পার বাবার মতামতের যথার্থতা পাঠ্য বইয়ের আলোকে বিশ্লেষণ করো।

উত্তর : ক) পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন।

খ) লর্ড কর্নওয়ালিস দশ সনা বন্দোবস্তকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বলে ঘোষণা করেন। এ ব্যবস্থায় রাজস্ব কিস্তি নির্দিষ্ট দিনে পরিশোধ করতে হতো। জমিদাররা নির্দিষ্ট দিনে রাজস্ব না দিতে পারলে জমি নিলামে বিক্রি করে কর পরিশোধ করা হতো। নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের আগে রাজস্ব পরিশোধের বিধান ছিল বলে একে ‘সূর্যাস্ত আইন’ বলা হয়।

গ) উদ্দীপকে অর্পার বাবা ইংল্যান্ডের কম্পানি তথা বণিকদের কথা বলেছিলেন। সমুদ্রপথে ইউরোপীয় বণিকদের সাফল্য দেখে ইংল্যান্ডের এক দল বণিক ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি নামে একটি বণিক সংঘ গড়ে তোলে। ১৬০০ সালে রানি এলিজাবেথের কাছ থেকে ১৫ বছর মেয়াদি প্রাচ্যের একচেটিয়া বাণিজ্যের সনদপত্র লাভ করে। কিন্তু বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এসে পলাশী যুদ্ধে জয়ী হয়ে সমগ্র ভারতবর্ষে ২০০ বছর শাসন করে এই ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি। উদ্দীপকে উক্ত বণিক দলের কার্যক্রমকেই তুলে ধরা হয়েছে। তাই বলা যায়, উদ্দীপকে অর্পার বাবা ইংল্যান্ডের ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির কথাই বলেছেন।

ঘ) ইংল্যান্ডের ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি সম্পর্কে অর্পার বাবার মতামতটি যথার্থ। সমুদ্রপথে ইউরোপীয় বণিকদের সাফল্য, প্রাচ্যের ধন-সম্পদের প্রাচুর্য ইত্যাদি দেখে ইংল্যান্ডের থেকে এক দল বণিক ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি’ নামক সংঘ গঠন করে ভারতবর্ষে আসে। ১৬০০ সালে রানি এলিজাবেথের কাছ থেকে ১৫ বছর মেয়াদি প্রাচ্যে একচেটিয়া ব্যবসার অনুমতি লাভ করেন। এ সনদপত্র নিয়ে তারা মোগল সম্রাট আকবরের দরবারে যান এবং তাঁর অনুমতি নিয়ে ১৬৬২ সালে সুরাটে বাণিজ্য কুঠি

স্থাপন করে। কম্পানি একে একে সুরাট, আগ্রা, আহমদাবাদ প্রভৃতি স্থানে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। এভাবে কুঠি স্থাপন করে তারা ক্রমে শক্তিশালী হতে থাকে। ধীরে ধীরে ইংরেজরা কলকাতা নগরীকে বাণিজ্যিক স্বার্থরক্ষা এবং রাজনৈতিক স্বার্থ বিস্তারের কেন্দ্রে পরিণত করে। ইংরেজদের ক্ষমতা আরো বৃদ্ধি পায়, যখন দিল্লির সম্রাট ফররুখশিয়ার তাদের শুল্কবিহীন বাণিজ্যের অনুমতি দেয়। এর ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে সারা ভারতবর্ষ আয়ত্ত করে প্রায় ২০০ বছর ইংল্যান্ডের ঔপনিবেশিক শাসনে বাংলাকে শাসিত রাখে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি।