বিশেষ প্রতিবেদন

”বঙ্গবন্ধু” হত্যাকান্ডের পর সরকার প্রধানদের জন্য যেভাবে বেড়েছে ভিভিআইপি নিরাপত্তা

দুর্বল নিরাপত্তার কারণেই কি ১৯৭৫ সালে ”বঙ্গবন্ধু” হত্যাকাণ্ড সম্ভব হয়েছিল? প্রতি বছর ১৫ই অগাস্টে ”বঙ্গবন্ধু’র মৃত্যুবার্ষিকীতে এই প্রশ্নটি ওঠে।

সেনাবাহিনীর ক’জন মধ্যসারির অফিসারের নেতৃত্বে সেদিন যে রক্তাক্ত অভ্যুত্থান ঘটেছিল তা যে প্রেসিডেন্টের বাসভবনের দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে সম্ভব হয়েছিল তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে তেমন কোনো মতবিরোধ নেই। খবর বিবিসির।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, সরকার বা রাষ্ট্র প্রধান হওয়ার পরও ঢাকায় ধানমন্ডির যে বাড়িতে ”বঙ্গবন্ধু” থাকতেন, নিরাপত্তার বিবেচনায় রাস্তার পাশে সেই বাড়িটি নিরাপদ ছিল না।

৩২ নম্বর সেই বাড়িতে কোনো ব্যক্তির প্রবেশ করার ক্ষেত্রেও তেমন কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হতো না।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগ্রেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন বিবিসিকে বলেন, ”বঙ্গবন্ধু” স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা ছিলেন বলেই হয়তো তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে সেভাবে ভাবেননি!

উনিতো নিজের বাড়িতে থেকেছেন। ঐ বাড়ি থেকেই তিনি পুরো মুভমেন্ট পরিচালনা করেছিলেন। ওখান থেকেই যা নির্দেশনা দেয়ার দিয়েছিলেন। কাজেই উনি ওখানেই কমফোর্ট ফিল করতেন। হয়তো তিনি ধারণাও করেন নাই যে এধরণের একটা ঘটনা ঘটবে।

”বঙ্গবন্ধু’র শাসনামলের শেষদিকে ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্ট নামে সেনাবাহিনীতেই নতুন একটি ইউনিট করা হয়েছিল। কিন্তু সেটিও রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান বা ভিভিআইপিদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষায়িত কোনো বাহিনী ছিল না।

কীভাবে শুরু হয় এসএসএফ? 
জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে উদ্যোগ নেন একটি বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের।

সেই বাহিনী এখন স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স বা এসএসএফ নামে কাজ করছে।

বাহিনীর সাবেক একজন মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমী জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তা বাহিনীর আদলে এসএসএফ যাত্রা শুরু করেছিল।

যখন প্রেসিডেন্ট এরশাদ আসলেন, (দক্ষিণ) কোরিয়ান প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা যেভাবে দেয়া হয়, তাদের আদলে একটা নতুন প্রোগ্রাম নেয়া হলো। আমাদের কিছু অফিসার সেসময় দক্ষিণ কোরিয়ায় যান। সেখানকার প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা বাহিনী কিভাবে তৈরি হয়েছে, তারা সেটা দেখে আসেন।

পরবর্তীতে এটা আরও বিস্তৃত হয় এবং আমেরিকাতে ইউনাইটেড স্টেট সিক্রেট সার্ভিস যেভাবে তৈরি, সেভাবে এই বাহিনীটাকে পুনর্গঠন করতে আমাদের কিছু অফিসার আমেরিকায় যায়, প্রশিক্ষণ নেয়। পরবর্তীতে সম্পূর্ণ সেই আদলেই এই বাহিনীটা গড়ে ওঠে। এখন এটা একটা পরিপূর্ণ ইনস্টিটিউশন হিসেবে গড়ে উঠেছে।

এসএসএফের সাবেক এই সাবেক মহাপরিচালক জানান, এসএসএফ এখন নিজেরাই নিজেদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে। নিরাপত্তা দেয়ার জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের নিজস্ব ব্যবস্থাও তারা গড়ে তুলেছে।

গণবিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি: গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানরা নির্বাচিত হয়ে আসেন। ফলে কঠোর নিরাপত্তার কারণে তারা অনেক সময় জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান কিনা, সেই প্রশ্নও অনেকে তোলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময় এসএসএফের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, নিরাপত্তার নামে তাঁকে যেনো জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করা না হয়।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ তত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মাহমুদা আকতার মনে করেন, গণতান্ত্রিক সরকারেরও রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানেরও নিরাপত্তা প্রয়োজন।

‘তাদের নিরাপত্তা অবশ্যই দরকার। যেহেতু তারা জনগণের জন্য কাজ করবেন, সুতরাং তাদের সিকিউরিটি বা তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। হতে পারে তারা যখন জনসমক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন, তখন হয়তো জনগণের সাথে সম্পৃক্ততার জন্য সেই মুহুর্তে নিরাপত্তা শিথিল করা যেতে পারে। কিন্তু সেটা অবশ্যই সবসময়ের জন্য নয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের নিরাপত্তার বিষয়টি এখন বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পেয়েছে। ফলে তারা চান বা না চান, তাদের সেই নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকতে হয়।

আবার, অন্য দিকে অশান্ত কারীরা, ওত পেতে বসে আছে দেশ কে কিভাবে অশান্ত করা যায়, সেই ব্যাপারে। এই সব কারনে, নিরাপরতা ব্যাবস্তা জোরদার করা অত্যান্ত জরুরী।