রাজনীতি

‘ফেনী মার্কা’ নির্বাচনের আলামত পাওয়া যাচ্ছে: রিজভী

পুলিশের বেপরোয়া আচরণ ও হয়রানিতে আবারো ‘ফেনী মার্কা’ নির্বাচনের আলামত পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

তিনি বলেছেন, বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে মামলা ও গ্রেফতার পাহাড়ি ঢলের মতো ধেয়ে চলেছে দেশব্যাপী। গতকালও ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, ঝিনাইদহ, ফেনী, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে বিনা মামলায়, বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

সোমবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

রিজভী বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর সীমাহীন জুলুমের পরও এখন দিনরাত বাড়িতে বাড়িতে হানা দিয়ে তল্লাশির নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রহরায় সারাদেশকে দাসশিবিরে পরিণত করা হয়েছে। নেতাকর্মীদের বাড়িতে না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের ওপরও হামলা করছে, মারধর করছে, কিংবা পরিবারের সদস্যদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘প্রিজাইডিং অফিসারদের নামের তালিকা সংগ্রহ এবং বিএনপির কোনো লোক নির্বাচনী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছে কি না ইত্যাদি তদারকি করছে র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা। সারাদেশে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিয়ে পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ মিলে তালিকা তৈরি করছে। স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষকদের মধ্যে কারা কারা সরকার দলের সমর্থক, কারা বিরোধী দলের সমর্থক তাদের তালিকা করছে তারা। এমনকি বিরোধী মতের সমর্থক হলে তাদের নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হচ্ছে বা তাদের হুমকি দিয়ে বলা হচ্ছে, আপনারা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবেন না। গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে মোবাইলেও তাদেরকে হুমকি দিচ্ছে। পুলিশের প্রকাশ্য ও গোপন হুমকিতে এ নিয়ে দেশজুড়ে শিক্ষকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।’

রিজভী বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের অবস্থান দেখে হাবুডুবু খাওয়াতেই নির্বাচনী মাঠ জনশূন্য করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি দেউলিয়া হয়ে গেছে বলেই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনাচারে লিপ্ত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন নেপথ্যলোকের বার্তানুযায়ী কাজ করছে বলেই ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষমতাসীনদের নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় চোখ বন্ধ করে রাখে।

তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ নেই বলেই এখন পর্যন্ত তাদের কোনো কাজ তারিফযোগ্য হয়নি। আইন, আদালত ও প্রশাসনকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করার পর কব্জার মধ্যে থাকা নির্বাচন কমিশনকে একেবারে গিলে ফেলেছে সরকার। এখন নোংরাভাবে ইসিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। কারণ ইসির কতিপয় কর্মকর্তা সেই সুযোগ করে দিয়েছে। আত্মা বিক্রির শর্তেই কতিপয় নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’

বিএনপির সিনিয়র এ নেতা বলেন, নির্বাচন কমিশন পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে সরকার। শুধু তাই নয়, প্রশাসনকেও নিয়ন্ত্রণ করছে সরকার কঠোরভাবে। দেশজুড়ে এখনও গায়েবি মামলা, গ্রেফতার, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে হানা দিয়ে নিপীড়ন অব্যাহত রয়েছে আগের মতোই। একজন নির্বাচন কমিশনার আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও প্রশাসনকে ইসির অধীনে নেয়ার প্রস্তাব করলেও সিইসি ও কতিপয় কমিশনার তাতে আপত্তি জানান। মূলত সরকারের হুকুম তামিল করতেই ব্যস্ত রয়েছে নির্বাচন কমিশন।

রিজভী বলেন, ‘ইসির কর্মকর্তা ও আওয়ামী নেতারা এখন কথা বলছেন একই সুরে। বেশ কিছু দিন আগে সিইসি বলেছিলেন, বাংলাদেশে শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, গত দুই দিন আগে আরেকজন কমিশনার বললেন অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে না। গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাহেবও বলেছেন, পৃথিবীর কোনো দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না, বাংলাদেশেও শতভাগ স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচন হবে না। আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তাদের বক্তব্য এক অশনিসংকেত।’

সিইসি ও ইসির বক্তব্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনিয়ম ও ভোট ডাকাতিতে উৎসাহিত করবে। তারা সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য শপথ নিয়েছেন, কিন্তু নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে তারা শপথ ভঙ্গ করেছেন। যে বক্তব্যটি অবৈধ শাসকগোষ্ঠীকেই উৎসাহ যোগাবে বলেও দাবি করেন বিএনপির এই নেতা।

বিটিভিসহ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনকে চাপ প্রয়োগ করে আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে বাধ্য করা হচ্ছে মন্তব্য করে রুহুল কবির বলেন, বিটিভি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান হলেও নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরও আওয়ামী লীগের পক্ষে একচেটিয়া প্রচারণা চালানো হচ্ছে। গতকাল একটি বেসরকারি টেলিভিশনে নির্বাচনী জনমত জরিপের নামে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে কৃত্রিমভাবে জনমত বেশি দেখিয়ে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। যা আচরণ বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘনই নয়, ক্ষমতাসীনদের পক্ষে নগ্ন দালালির নামান্তর মাত্র।

‘রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিসহ বেসরকারি টেলিভিশনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কোনো চিহ্নই নেই, তফসিল ঘোষণার পরও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিসহ কতিপয় বেসরকারি টেলিভিশন নির্লজ্জ মোসাহেবি করছে সরকারি দলের পক্ষে। আমি অবিলম্বে সকল টেলিভিশনকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের ব্যবস্থা নিতে ইসির প্রতি আহবান জানাচ্ছি।’

নেতাকর্মীদের গ্রেফতার প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, শাহজাহানপুর থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সোহাগ ভূঁইয়াকে গোয়েন্দা পুলিশ কর্তৃক আটকের পরও এখনও অস্বীকার করা হচ্ছে। সোহাগকে ধরতে গিয়ে তার বোন সেলিনাকে আটক করা হয়। পরে সোহাগকে আটকের পর তার বোনকে ছেড়ে দেয়া হয়। গোয়েন্দা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করলেও এখনও স্বীকার করছে না। তাকে যে ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়েছে সে ব্যাপারে তার পরিবার নিশ্চিত। কেন তাকে আটকের বিষয়টি স্বীকার করছে না পুলিশ তা গভীর আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বাড়ির সামনে থেকে রাকিবসহ ১৫ জন বিএনপি নেতাকর্মীকে আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। আটক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো মামলা নেই।

তিনি বলেন, বেশ কিছু দিন থেকে লক্ষ্য করছি যে, আমি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব এ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, আমার নামে কয়েকটি ভুয়া ফেসবুক এ্যাকাউন্ট খুলে বিভিন্ন বক্তব্য, মন্তব্য, মতামত প্রকাশ করা হচ্ছে। আমি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, আমার নামে আমি কোনও ফেসবুক আইডি খুলিনি। সুতরাং এই সমস্ত ভুয়া আইডির কোনো মতামতের সঙ্গে আমার কোনও সংশ্লিষ্টতা নেই এবং এর কোনো দায়-দায়িত্বও আমার নেই। সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করব, এই সব ভুয়া আইডি খুলে আমার নামে চালানো থেকে বিরত থাকার জন্য। ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করছি, এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য।