আইন আদালত

পথে পথে চাঁদা আদায়

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে পশুবাহী ট্রাকগুলোর যাত্রা এখন ঢাকামুখী। তবে এই যাত্রা নির্বিঘ্ন নয়। কোথাও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, কোথাও শ্রমিক ইউনিয়ন, কোথাও ফেরিঘাটের দায়িত্বে থাকা কর্মচারী, কোথাও দালালরা চাঁদাবাজি করছে এসব ট্রাকে। ব্যবসায়ী, ট্রাকচালক-হেলপারদের পাশাপাশি পশুগুলো যেন জিম্মি এই চাঁদাবাজদের কাছে

কোরবানির ঈদ উপলক্ষে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের অন্তত ১৫টি পয়েন্ট দিয়ে হাজার হাজার গরু-মহিষ আসছে। বন্ধ থাকা সীমান্ত ঘাটগুলোও প্রায় এক মাস ধরে খুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে এসব ঘাট দিয়ে অনায়াসেই আসছে গরু-মহিষ। গড়ে প্রতিদিন অন্তত ৪০ হাজার গরু-মহিষ ঢুকছে বাংলাদেশে।

কিন্তু রাজশাহীর হাটগুলোতে আমদানি করা গরু বা মহিষের দামও কমেনি। বরং গতবারের চেয়ে এবার প্রতি মণ মাংস হিসেবে অন্তত এক হাজার টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে গরু। মহিষেরও একই অবস্থা।

অভিযোগ উঠেছে, পথে পথে দুই দেশের সিন্ডিকেটই গরুপ্রতি বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ায় বাজারে গরুর দাম কমছে না। ব্যবসায়ীরা জানান, সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা ভারতের পাচারকারী এনামুল এবং বাংলাদেশের ঘাট মালিকরা।

রাজশাহীর সিটি হাটে এক ভারতীয় গরু ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, সীমান্ত এলাকায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলার চোরাকারবারি এনামুল। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা দুটি গরু-মহিষে আদায় করে ৩২ থেকে ৪০ হাজার ভারতীয় রুপি। এই অর্থ নেওয়া হয় শুধু সীমান্তের দুই কিলোমিটার এলাকা পার করে দেওয়ার জন্য। এর পরেও পথে পথে চাঁদা দিতে হচ্ছে বাংলাদেশি গরু ব্যবসায়ীদের। এতে করে প্রতিটি গরু বা মহিষের দামের সঙ্গে যোগ হচ্ছে অতিরিক্ত ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। আর তাতে ভারতীয় গরু বাংলাদেশে আনার পর দেখা যায়, দেশি গরুর সমান দাম পড়ছে।

বাংলাদেশি গরু ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে জানান, কয়েক বছর ধরে কথিত প্যাড (টোকেন) ব্যবস্থার প্রচলন করে ভারতীয় সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে ভারতের এনামুল ও তার তিন ভাগ্নে পিন্টু, জেন্টু ও অন্টু।

আর বাংলাদেশি সিন্ডিকেটের ঘাট মালিকরা নানা অজুহাতে গরুপ্রতি পাঁচ-সাত হাজার টাকা আদায় করছে। এর মধ্যে ঘাটের চাঁদা, প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী এবং থানা ‘ম্যানেজ’ করার নামে আদায় করা হচ্ছে এসব টাকা। ফলে একেকটি গরু ভারত থেকে আনতেই কখনো কখনো ৫০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে যাচ্ছে।

গরু ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কেউ ওই সিন্ডিকেটের প্রতিবাদ করলে তাঁকে আর ঘাটে ভিড়তে দেওয়া হচ্ছে না।

ব্যবসায়ী সূত্র জানায়, প্রায় বছরখানেক বন্ধ ছিল রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের অন্তত ১৩টি ঘাট। চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুটি ঘাট শুধু খোলা ছিল। ওই দুটি ঘাট দিয়ে বিজিবির বেঁধে দেওয়া সীমার আওতায় গরু আনতে পারত ব্যবসায়ীরা। তবে মাসখানেক ধরে রাজশাহীর চারটিসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের আরো অন্তত আটটি ঘাট খুলে দেওয়া হয়েছে।

রাজশাহীর সিটি হাটের গরু ব্যবসায়ী আকবর আলী বলেন, ‘গতবারের চেয়ে এবার প্রতিটি গরুর দাম একটু হলেও বেড়েছে। কিন্তু ভারতীয় গরুর দাম কেন বাড়ছে বুঝতে পারছি না। হয়তো সীমান্তে অতিরিক্ত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।’

এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্ত এলাকা চরনারায়ণপুর ও জোহরপুর এলাকার লোকজন জানান, জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে পদ্মা নদী দিয়ে বিচ্ছিন্ন জোহরপুর, জোহরপুর ট্যাক, অহেদপুর, ফতেপুর ও রঘুনাথপুর সীমান্ত পয়েন্টগুলোকে বেছে নিয়ে গরুর প্যাড ব্যবসার পাশাপাশি সোনা ও হুন্ডি পাচার চালাচ্ছে এনামুল সিন্ডিকেট।

এই সিন্ডিকেটের আস্থাভাজন হিসেবে সীমান্তে অবৈধ কারবার দেখাশোনা করে জামায়াত নেতা শরীয়তুল্লাহ লাহু, তরিক ইসলাম এবং রাজশাহীর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার মুকুলসহ অন্তত ২০ জন ঘাট মালিক। তারা ভারতীয় সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সীমান্ত এলাকায় গরুপ্রতি বিপুল পরিমাণ চাঁদা আদায় করে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সীমান্ত এলাকায় দায়িত্বে থাকা বিজিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গরু-মহিষ আসছে ব্যাপক হারে। কিন্তু এর সুফল বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা তেমন পাচ্ছে না। ফলে বাজারে দামও কমছে না। এর অন্যতম কারণ হলো ঘাটে দুই দেশের সিন্ডিকেটের ব্যাপক চাঁদাবাজি। এই চাঁদাবাজি বিজিবির পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বিজিবির দায়িত্ব হলো গরু-মহিষগুলোর ঠিকমতো রাজস্ব দেওয়া হচ্ছে কি না তা দেখা। সেটি দেখেই বিজিবি ঘাট দিয়ে গরু-মহিষ আসার অনুমোদন দিয়ে থাকে।