জাতীয়

নুসরাতকে ছাদে শোয়ান মণি, শরীরে কেরোসিন দেন জাবেদ

ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দী দিয়েছেন তার দুই সহপাঠী কামরুন নাহার মণি ও জাবেদ হোসেন। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে জাবেদ বলেছেন, তিনি নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢালেন। পরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আরেক আসামি কামরুন নাহার মণি বলেন, নুসরাতকে ছাদে জোর করে শোয়ানোর পর তাকে চেপে ধরেছিলেন তিনি। জাবেদ পরিচয় গোপন করার জন্য বোরকা পরে ছিলেন।

২০ এপ্রিল, শনিবার বিকেলে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শরাফ উদ্দিন আহম্মদের আদালতে তাদের উপস্থাপন করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী জবাবন্দী রেকর্ডের পর রাত ১০টার দিকে তাদের জবানবন্দীর ব্যাপারে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পিবিআই’র চট্টগ্রাম বিভাগের স্পেশাল পুলিশ সুপার মো. ইকবাল।

মো. ইকবাল জানান, সহপাঠী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন মণি ও জাবেদ। দুজনের মধ্যে জাবেদ নুসরাতের সারা শরীরে কেরোসিন ঢেলে দেন। আগুন ভালো করে লাগার জন্য মণি নুসরাতের বুকসহ শরীর চেপে ধরেন।

তিনি আরও জানান, দুজনেই নুসরাত হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। এ ছাড়া পিবিআই কার্যালয়ে কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদে তারা আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে এই হত্যাকাণ্ডে আরও নতুন কিছু নামও উঠে এসেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তা উল্লেখ করা যাবে না।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই পরিদর্শক মোহাম্মদ শাহ আলম জানান, কামরুন নাহার মণিকে ১৬ এপ্রিল গ্রেফতার করে পরদিন পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়। তিনি হত্যার ঘটনায় অংশ নেওয়া পুরুষদের জন্য তিনটি বোরকা সরবরাহ করেন। অপরদিকে জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদকে ১৩ এপ্রিল গ্রেফতার করে ওই দিনই আদালতের মাধ্যমে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। গতকাল শুক্রবার আবার আদালতে হাজির করে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয় তাকে।

জাবেদ হোসেন ও কামরুন নাহার মণি দুজনই ওই মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী এবং নুসরাতের সহপাঠী ছিলেন।

এর আগে নুসরাত হত্যার পাঁচ আসামি নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, আবদুর রহিম শরিফ, আবদুল কাদের ও উম্মে সুলতানা পপি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। তারা পাঁচজনই নুসরাত হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করে তথ্য দিয়েছেন।

আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ১৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা হলেন—অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ-দৌলা, কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম, শিক্ষক আবছার উদ্দিন, সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নূর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ জনি, মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, শাহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষের ভাগ্নি উম্মে সুলতানা পপি, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের হোসেন, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, মো. শামীম, কামরুন নাহার মণি, জান্নাতুল আফরোজ মনি, শরীফ, হাফেজ আবদুল কাদের ও আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন।

প্রসঙ্গত, নিহত নুসরাত সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন। ওই মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার বিরুদ্ধে তিনি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেন। নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। এ সময় তাকে কৌশলে পাশের বহুতল ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। পরে গত ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন নুসরাত মারা যান। এই ঘটনায় নুসরাতের ভাইয়ের দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই।