খেলাধুলা

নতুন করে পুরনো ট্র্যাজেডি

সেই ফুলটস আর মিড উইকেটের ফিল্ডার—মুশফিকুর রহিমকে এই নিয়ে তিনবার খুঁজে পেল লো ফুলটস আর তিনি খুঁজে নিলেন ঠিক একই জায়গায় দাঁড়ানো ফিল্ডারকে। ওই শটের আগে যাঁর হাতে ম্যাচসেরার পুরস্কার কল্পনায় দেখে ফেলেছিলেন অনেকেই, সেই তাদের অনেকের চোখেই তিনি এখন খলনায়ক!

ক্রিকেটে একটা ইনিংসে ব্যাটসম্যানের ক্যারিয়ার বদলে যাওয়ার অসংখ্য ঘটনা আছে। আর মুশফিকের বুকে কিনা এক এক করে তিনটি ফুলটস বিঁধল শেল হয়ে। বুধবার গায়ানায় সিরিজ জয়ের চৌকাঠ থেকে বাংলাদেশের অভাবিত হোঁচট খাওয়ার চিত্রনাট্যে এ দৃশ্যটাই চোখ জ্বালাবে অনেক দিন মুশফিককে এবং দেশের ক্রিকেট অনুসারীদের।

অবশ্য মুশফিককে একা শূলে চড়ালে তাঁর প্রতি অন্যায়ই হবে। ম্যাচের ফ্ল্যাশব্যাকে তো ‘অপরাধী’র অভাব নেই বাংলাদেশ দলে। ৪৯তম ওভারে সাব্বির রহমান আরেকটি ফুলটসে ডিপ মিড উইকেটে ক্যাচ দেওয়াতেই না ভীতি সঞ্চারিত হয় বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে। মুশফিকের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি না হলে তো আরো আগেই নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে ম্যাচ শেষ করে ফিরতে পারতেন মাহমুদ উল্লাহ। এরও আগে টানা দ্বিতীয় ম্যাচে বড় জুটি গড়েছেন তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান। তবে তাঁদের আউট হওয়ার ধরনে খুশি হওয়ার কোনো কারণ নেই। তামিম আউট হয়েছেন দেবেন্দ্র বিশুকে ডাউন দ্য উইকেটে এসে মারতে গিয়ে। আর সাকিব ক্যাচ দিয়েছেন শরীরের অনেকটা দূর থেকে অ্যাশলে নার্সকে চালাতে গিয়ে।

আরো পেছনে গেলে মনের আয়নায় ভেসে উঠবে ডিপ মিড উইকেটেরই আরেকটি কষ্টের ছবি। শিমরন হেটমায়ার পুল করেছেন রুবেল হোসেনকে। ‘আকাশচুম্বী’ সেই ক্যাচের নিচেও গিয়েছিলেন সাকিব। কিন্তু তালুবন্দি করতে পারেননি। কুড়িয়ে পাওয়া সুযোগটা কাজে লাগিয়ে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ওয়ানডে সেঞ্চুরি করেছেন গায়ানার এ তরুণ। ব্যক্তিগত ৭৯ রানের ইনিংসটাকে তিনি নিয়ে গেছেন ১২৫ রানে। অঙ্কের হিসাবেই ব্যবধান ৪৬ রানের। তবে ম্যাচের শেষদিকের দৃশ্যপটে হেটমায়ারের সেঞ্চুরির স্মৃতি আর অতটা পীড়াদায়ক নয়। সবটুকু বেদনা মাহমুদ উল্লাহর রান আউট এবং সাব্বির আর মুশফিকের কার্বন কপি আউটের দৃশ্যকে ঘিরে। তবে শেষ দৃশ্যের আলোটা তো গিয়ে পড়ছে এ ম্যাচে বাংলাদেশের জন্য সেরা ইনিংস খেলা মুশফিকের ওপরই।

শেষ ওভারে ৮ রান দরকার—ক্রিজে ৬৬ বলে ৬৮ রান করে ফেলা মুশফিকের সঙ্গে ৫ উইকেট অক্ষত থাকার বাড়তি আত্মবিশ্বাস। জেসন হোল্ডার ‘উপহার’ হিসেবে ওভারের প্রথম বলটা ফুলটস দিয়েছিলেনও। তবে সেই ফুলটসের গন্তব্য তো শুরুতেই বলা হয়েছে। ২০১৬ সালে ভারতের বিপক্ষে হায়দরাবাদে এবং সবশেষ আফগানিস্তানের বিপক্ষে দেরাদুনের পর গায়ানাতেও ডিপ মিড উইকেট ফিল্ডারের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন মুশফিক। ওই আউটের পর গ্যালারির উল্লাস আর বাংলাদেশ দলের নেতিয়ে পড়া দেখেই আঁচ করা যাচ্ছিল কী ঘটতে যাচ্ছে। ‘প্যানিক’—ম্যাচের পর ঠিক এ শব্দটাই ব্যবহার করেছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। ওদিকে প্রথম বলেই উইকেট উপহার পেয়ে রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘের মতোই মরণথাবা বসিয়েছেন ক্যারিবীয় অধিনায়ক জেসন হোল্ডার। আগের ৯ ওভারে ৬৩ রান দেওয়া এ পেসার শেষ ওভারে দিয়েছেন মাত্র ৫ রান। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ওভারটি হোল্ডার করেছেন এদিন। সিরিজ হারের প্রবল শঙ্কা থেকে এক ঝটকায় দলের জন্য জয়ের রাজপথ তৈরি করে দিয়েছেন তিনি।

অথচ টস জিতে টানা দ্বিতীয়বার এভিন লুইসকে ফিরিয়েছিলেন মাশরাফি। ভয়ংকর হয়ে ওঠার আগে ফেরানো গেছে ক্রিস গেইলকেও। একজন হেটমায়ার ছাড়া পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস নেই আর কোনো ক্যারিবীয়রই। তবে তাঁর সঙ্গে পঞ্চম উইকেটে ১০২ রানের জুটি গড়ে ব্যাটসম্যানশিপের দায় মিটিয়েছেন রোভম্যান পাওয়েল। তাতে ৩ বল আগে অল আউট হয়ে গেলেও ২৭১ রানের পুঁজি পেয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। অবশ্য স্বাগতিকদের অত দূর যাওয়ার পেছনে বাংলাদেশি বোলার-ফিল্ডারদের অবদানও কম নয়। সাকিবের ক্যাচ ছাড়াও গ্রাউন্ড ফিল্ডিংও ভালো হয়নি। তার ওপর ডেথ ওভারে আবারও মার খেয়েছেন সবচেয়ে বেশি ৩ উইকেট নেওয়া রুবেল হোসেন। তাঁর শেষ ওভার থেকেই এসেছে ২২ রান!

নিজেরা ইনিংসের শেষভাগে রান দিয়েছেন অকাতরে। আবার নিজেদের ইনিংসের শেষভাগে রানের গতি বাড়াতে পারেনি বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে বাদ দিলে মাশরাফিদের এ সমস্যা বহুদিনের। আরো পুরনো সিনিয়রদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জুনিয়র ক্রিকেটারদের যুদ্ধ করার মানসিকতায় তীব্র ঘাটতি। ক্যারিবীয় দলে প্রতিষ্ঠিতদের ব্যর্থতা আড়াল করে দিতে পারেন হেটমায়ারের মতো তরুণ। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় একটু চাপে পড়লেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েন তরুণ ক্রিকেটাররা। এ ধারা মেনে নিতে পারলে অবশ্য বুধবারের ‘গায়ানা ট্র্যাজেডি’ অতটা পীড়াদায়ক আর মনে হবে না!

ওহ, এই হতাশার মাঝেও কিছু সান্ত্বনা আছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে ওয়ানডে ইতিহাসে নিজেদের দ্রুততম ফিফটি করেছে বাংলাদেশ। আর তিনটি রিভিউর সবগুলোই ঠিকঠাক নিয়েছে বাংলাদেশ। ‘ডিআরএস’ যুগে এটাও মাশরাফিদের নতুন রেকর্ড!