আর্ন্তজাতিক

ট্রাম্পের ‘আনুগত্যের রাজ্যে’ ধস নামছে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে বসার পর থেকেই একের পর এক রদবদল করে মোটামুটি একটা মন্ত্রিসভা দাঁড় করিয়েছেন ধনাঢ্য রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্যাপক রদবদলের মধ্য দিয়ে তিনি যে অনুগত দলটি গড়েছেন, তাতেও বুঝি শেষ রক্ষা হচ্ছে না। সেই আনুগত্যে টান পড়তে শুরু করেছে। তাই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারকালে বদনাম ঠেকানোর স্বার্থে অর্থ দিয়ে দুই নারীর মুখ বন্ধ রাখার দায়ে ট্রাম্পের অভিশংসিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আর টেলিভিশন তারকা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্ক স্থাপন ও হয়রানির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারকালে এমনই দুই অভিযোগ ধামাচাপা দিতে তিনি তাঁর আইনজীবী মাইকেল কোহেনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দুই নারীকে বড় অঙ্কের অর্থ দিয়েছিলেন—এসংক্রান্ত মামলায় কোহেন আদালতে দোষী প্রমাণিত হয়েছেন। কিন্তু কোহেনের ওই মামলায় খালাস পেয়ে গেছেন ট্যাবলয়েড পত্রিকা ন্যাশনাল এনকোয়ারারের প্রধান নির্বাহী ডেভিড পেকার। বলা দরকার, গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর পত্রিকা সর্বাত্মকভাবে ট্রাম্পের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে। এদিকে আরেক আর্থিক অপরাধে অপরাধী প্রমাণিত হয়েছেন ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারবিষয়ক সাবেক চেয়ারম্যান পল ম্যানাফোর্ট।

কোহেন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয়ে যায়। অন্য একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (এফবিআই) এ বছরের শুরুতে যখন কোহেনের কার্যালয়ে অভিযান চালায়, তখন ট্রাম্প অবলীলায় কোহেনের দায়-দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়েছিলেন। ওই সময় এমন চপেটাঘাত খাওয়া কোহেন পরে তদন্তকারীদের কাছে স্বীকার করেন, নির্বাচনী প্রচারকালে দুই নারীর মুখ বন্ধ রাখতে তাঁদের অর্থ দিতে বলেছিলেন খোদ ট্রাম্প। ফলে নির্বাচনী ব্যয়ের অপব্যবহারে ট্রাম্পের নাম এখন সরাসরি জড়িয়ে গেছে। এমন অপব্যয়ের দায় শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে অভিশংসিত করতে পারে, এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এ অবস্থায় ট্রাম্প নতুন করে তুলোধোনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশনসকে, যাঁকে নিয়োগ দিয়েছিলেন তিনি নিজে। নানা কারণে সেশনসের ওপর খাপ্পা প্রেসিডেন্ট গত বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ শীর্ষক টক শোতে বলেন, ‘আমি আপনাদের বলছি কী হতে যাচ্ছে, আমি যদি অভিশংসিত হই, তাহলে বাজারে ধস নামবে বলে আমার ধারণা। আমার ধারণা সবাই গরিব হয়ে যাবে।’ প্রেসিডেন্টের ভূমিকায় নিজেই নিজের প্রশংসা করে তিনি আরো বলেন, ‘যে লোক অসাধারণ কাজ করেছে, তাকে কী করে আপনারা অভিশংসিত করবেন, সেটা আমি বুঝতেই পারছি না।’

২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগে যে তদন্ত চলছে, তা থেকে গা বাঁচিয়ে চলা সেশনসের ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ ট্রাম্প ফক্স নিউজকে আরো বলেন, ‘সেই লোক (অ্যাটর্নি জেনারেলের) দায়িত্ব নিল আর তারপর বলল, আমি নিষ্কৃতি নিয়ে নেব। আমার কথা হলো, এ কেমন ধরনের লোক? যা-ই হোক, সে কিন্তু নির্বাচনী প্রচারে ছিল। তাকে ওই দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে আমার একটাই কারণ, আমি তাকে অনুগত ভেবেছি।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের অভিযোগ ইস্যু নিয়ে এর আগেও সেশনসের সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। এত দিন চুপ থাকলেও ট্রাম্পের গত বৃহস্পতিবারের বক্তব্যের জবাব দিতে ছাড়েননি বিচার বিভাগীয় প্রধান সেশনস। তিনি বলেন, ‘আমি অ্যাটর্নি জেনারেল থাকা অবস্থায় বিচার বিভাগ কোনো অনাহূত রাজনৈতিক বিবেচনার দ্বারা প্রভাবিত হবে না। আমি সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে চাই এবং যেখানে সেটা আমি পাই না, সেখানেই পদক্ষেপ নিই।’

ট্রাম্পের অনুগত দল থেকে ব্যক্তিগত আইনজীবী কোহেন এবং সেই সঙ্গে বিচার বিভাগীয় প্রধান সেশনসের এই সরে যাওয়ার মানে ট্রাম্পের দুর্গের পতনের শুরু, এমনটাই মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের অনেকে। প্রেসিডেন্টের পক্ষে এখনো অনেক সমর্থকের শক্ত অবস্থান রয়েছে বটে, তবে তাঁর অনুগতদের রাজ্যে যে ধস নেমেছে, সেটাকে মোটেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই বলে তাঁরা মনে করছেন।

সূত্র : সিএনএন, এএফপি।