সারাদেশ

টার্গেট শ্বশুরবাড়ির ভোটব্যাংকও

শেষ মুহূর্তে এসে সিলেটের সিটি নির্বাচনে ‘ভোট ব্যাংক’ এর হিসাব বড় করে সামনে চলে এসেছে। দলীয় ভোটের হিসাবের পাশাপাশি সংখ্যালগু ভোট, আঞ্চলিক ভোট, বস্তিকেন্দ্রিক ভোট, ধর্মভিত্তিক ভোট—সবই আলোচিত হচ্ছে। আলোচনায় আছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীর ‘শ্বশুরবাড়ি’ ভোট প্রসঙ্গটিও। বৃহত্তর ময়মনসিংহের জামাই হিসেবে কামরান ও আরিফুল এই দুই প্রার্থীকেই তুলে ধরা হচ্ছে ওই অঞ্চলকেন্দ্রিক ভোটারদের কাছে।

বদরউদ্দিন আহমদ কামরান এবং আরিফুল হক চৌধুরী, দুজনেরই শ্বশুরবাড়ি বৃহত্তর ময়মনসিংহে। কামরানের স্ত্রী আসমা কামরানের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার বাসাইল উপজেলার ময়তা গ্রামে। বাবার চাকরির সুবাদে ছোটবেলা থেকেই সিলেটে ছিলেন আসমা কামরান। অন্যদিকে  আরিফুলের স্ত্রী শ্যামা হকের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের নওমহালে। ১৯৯১ সালে বিয়ের পর থেকে তিনি সিলেটেই থাকেন। শুধু প্রার্থী নন, তাঁদের স্ত্রীরাও বসে নেই। সিলেটে বসবাসরত নিজ নিজ জেলার ভোটারদের কাছে গিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইছেন তাঁরা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ বসবাস করে সিলেট নগরীতে। বিভিন্ন পেশাগত কাজ এবং কর্মসূত্রে কয়েক দশকে সিলেটের বাসিন্দা হয়েছে তারা। ভোটের হিসাব-নিকাশে ময়মনসিংহের সেসব মানুষই এখন জয়-পরাজয়ে ভূমিকা রাখছে। ওই সব ভোট নিজের বাক্সে টানতে শ্বশুরবাড়ির পরিচয়কে কাজে লাগাচ্ছেন দুই মেয়র পদপ্রার্থী। বৃহত্তর ময়মনসিংহের জামাই হিসেবে নিজের পরিচয় তুলে ধরে ভোট চাচ্ছেন ওই সব ভোটারের কাছে।

অঞ্চলের সমীকরণ থেকে বরাবরের মতো এবারও ‘সিলেটস্থ বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমিতি’র মতো অঞ্চলভিত্তিক সংগঠনগুলোর কদর বেড়েছে। সিটি করপোরেশনে ময়মনসিংয়ের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ বসবাস করে। তাদের মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার ভোটার। নির্বাচনের হিসাব-নিকাশে এটি বড় প্রভাবক হওয়ায় নির্বাচন এলেই এদিকে আলাদা দৃষ্টি দেন প্রার্থীরা। তখনই আলোচনায় চলে আসেন দুই মেয়র পদপ্রার্থীর সহধর্মিণীরা। তাঁরা দুজনই ময়মনসিংহ সমিতির উপদেষ্টা। দুজনই স্বামীর পক্ষে ভোট চাইতে ছুটছেন সমিতির সদস্যদের কাছে।

কামরানপত্নী আসমা কামরান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিলেটে বসবাসকারী বৃহত্তর ময়মনসিংহের বাসিন্দাদের ভোট অতীতেও কামরানের পক্ষে এসেছে, এবারও আসবে বলেই আমার বিশ্বাস।’ একই দাবি আরিফুল হক পত্নী শ্যামা হক চৌধুরীর। তিনি বলেন, ‘গত নির্বাচনে ময়মনসিংহের মানুষ আরিফের পক্ষেই দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর বিজয়ে ভূমিকা রেখেছিলেন। এবারও রাখবেন বলেই বিশ্বাস।’

আরিফ মেয়র পদে নির্বাচনে দাঁড়ানোর আগে পর্যন্ত এই বিশাল ভোট ব্যাংকে একক আধিপত্য ছিল কামরানের। কিন্তু আরিফ গতবার নির্বাচনে দাঁড়ালে সেখানে ভাগ বসান তিনি। ময়মনসিংহ সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌফিকুল আলম বাবলু বলেন, ‘সিলেট সিটি নির্বাচনে প্রধান দুই মেয়র পদপ্রার্থী কামরান ও আরিফ ময়মনসিংহ অঞ্চলের জামাই। সে কারণে ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষ তাঁদের ওপর কিছুটা দুর্বল। ভোট তাঁরাই পাবেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সমিতির নেতা বলেন, ‘বৃহত্তর ময়মনসিংহের জামাই হিসেবে প্রতিটি নির্বাচনে কামরানই ভোট পেতেন। কিন্তু গত নির্বাচন থেকেই দুজনের বাক্সেই পড়ছে আমাদের ভোট।’

ধর্মভিত্তিক ভোটের অঙ্ক : গত নির্বাচনে ধর্মভিত্তিক ভোটগুলোতে প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য ছিল বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর। দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে হেফাজতে ইসলামের সমর্থনও গিয়েছিল তাঁর দিকে। ২০ দলীয় জোটে একাধিক প্রার্থী না থাকায় জামায়াতে ইসলামীর বেশির ভাগ ভোটও তিনি পেয়েছিলেন। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। হেফাজতে ইসলামের নেতারা গত নির্বাচনে আরিফের পক্ষে জোরালো মাঠে থাকলেও এবার সেইভাবে ভোটের মাঠে দেখা যায়নি তাদের। হেফাজতের ভোটও দুজনের বাক্সে যাবে বলে মনে করছে নগরবাসী।

এ ছাড়া এবার ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীর সিলেট মহানগর আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় বড়সংখ্যক ভোট পাচ্ছেন না আরিফ। এবার জামায়াত সঙ্গে না থাকায় জামায়াত-শিবিরবিরোধী ইসলামী দলগুলোর অনেক ভোট আরিফের দিকে যেতে পারে। বিএনপির একটি বড় অংশ মনে করছে, জামায়াত বিএনপির সঙ্গে না থাকায় সংখ্যালঘু ভোটারদেরও একটি অংশ আরিফের বাক্সে যেতে পারে।

সংখ্যালঘু ভোট : সিলেটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটে একক আধিপত্য ছিল নৌকার। সর্বশেষ সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের বাকশোতেই পড়েছিল তাদের ভোট। কিন্তু মেয়রের দায়িত্ব পেয়ে আরিফ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন জয় করতে নানা উদ্যোগ নেন। সনাতন ধর্মাবলম্বী একজন সংস্কৃতিকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নগরের চালিবন্দরে সনাতন সম্প্রদায়ের একমাত্র শ্মশান চালিবন্দর শ্মশানঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন, সাগরদিঘীর পারে মণিপুরি সম্প্রদায়ের শ্মশানঘাটের উন্নয়ন, মির্জাজাঙ্গাল, লালদিঘীরপার, আম্বরখানা বড়বাজার মণিপুরিপাড়ার জলাবদ্ধতা নিরসন তিনি আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে চাওয়ার আগেই কয়েকগুণ বাড়িয়ে অনুদান দিয়ে তাদের মন জয় করে নিয়েছেন আরিফুল। তাই সংখ্যালঘুদের ভোট এবারে আরিফের বাক্সেও যেতে পারে।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে এসেছেন অনেক প্রবাসী সিলেটি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা চৌকিদেখীর বাসিন্দা ইশতিয়াক আহমদ বলেন, ‘আমরা দেশের বাইরে থাকলেও মন পড়ে থাকে দেশে। ঈদ, ভোটসহ উৎসবের উপলক্ষ পেলেই আমরা তাতে অংশগ্রহণের চেষ্টা করি। এতে সবাইকে এক সঙ্গে পাওয়ারও সুযোগ থাকে।’ যুক্তরাজ্য প্রবাসী আহাদ চৌধুরী বাবুও এসেছেন নির্বাচন উপলক্ষে। নগরের খাসদবীর এলাকার বাসিন্দা আহাদ বলেন, ‘যানজটমুক্ত একটি পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক নগর হিসেবে সিলেটকে দেখতে চাই আমরা। সে জন্য মেয়র ও নিজের এলাকার কাউন্সিলর প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে এসেছি। পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে সাধ্যমতো কাজও করে যাচ্ছি।’

নির্বাচনের শেষ সময়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শেষ মুহূর্তে কিছুটা উত্তেজনা থাকতে পারে। তবে এমন পরিবেশ না হোক, যাতে মানুষ ভোট কেন্দ্রে যেতে ভয় পায়। প্রশাসন সবার প্রতি সমান আচরণ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নির্বাচন যাতে কোনোভাবেই প্রশ্নবোধক না হয়। কিন্তু প্রশাসনের ভূমিকায় মনে হচ্ছে তারা নির্বাচনকে প্রশ্নবোধক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।’