জাতীয়

টানা তিন দিনের ছাত্রবিক্ষোভে যেভাবে ধাক্কা খেলো রাজধানী

নিরাপদ সড়ক ও নৌমন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবিতে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের টানা তৃতীয় দিনের অবরোধে কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল ঢাকাবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা দেখেও সয়ে যাওয়া রাজধানী যেন বিশাল ধাক্কা খেলো এবারের ছাত্রবিক্ষোভে। গত রবিবার (২৯ জুলাই) বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও আব্দুল করিম রাজিব নিহত হওয়ার প্রতিবাদে পরদিন সোমবার সকাল থেকেই সড়কে সড়কে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে পড়ুয়া সহপাঠীদের বিক্ষোভ।

ছাত্রবিক্ষোভের প্রথম দিন সোমবার সকালে দুই বাসচালকের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন শুরু করলে পুলিশের বাধায় কর্মসূচি পণ্ড হয়ে যায়। পুলিশের বাধার খবরে ওই কলেজসহ আশপাশের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা হোটেল র‍্যাডিসন ব্লুর সামনের রাস্তায় নেমে আসে। ছাত্রদের অবরোধে বিমানবন্দর সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার সকাল থেকে ঘাতক বাসচালকের বিচার এবং অশোভন হাসির দায়ে নৌমন্ত্রীর পদত্যাগসহ ৯ দফা দাবিতে রাজধানীর অন্তত বারোটি পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে শিক্ষার্থীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এসময় বেশ কয়েকটি বাসে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালান বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। বেশ কয়েকটি স্থানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

সকালে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা মুখে কালো কাপড় বেঁধে দুর্ঘটনাস্থলে মানববন্ধন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু পুলিশি বাধায় তাদের কর্মসূচি ফের পণ্ড হয়ে যায়। বিমানবন্দর-গাজীপুর সড়কের দুইপাশে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করলে বিমানবন্দর সড়কে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিক্ষার্থীদের কয়েকদফা লাঠিচার্জ করে পুলিশ।

উত্তরার জসিমউদ্দিন রোড মোড়ে বিজিএমইএ বিশ্ববিদ্যালয় ও উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশেপাশের ৮-১০টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সকাল থেকে রাস্তা বন্ধ করে বিক্ষোভ করে। এ সময় বুশরা পরিবহন ও এনা পরিবহনের দুইটি বাসে অগ্নিসংযোগ করে শিক্ষার্থীরা। এছাড়া বেশ কয়েকটি বাস ও ট্রাকে ভাঙচুর চলে।

সকাল থেকে রামপুরা ব্রিজের ওপর ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও মধ্যবাড্ডায় গুলশান কমার্স কলেজ শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিলে পুরো মালিবাগ-বাড্ডা পর্যন্ত অচালবস্থা সৃষ্টি হয়।

নাবিস্কো মোড়ে সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিলে বন্ধ হয়ে যায় মহাখালী মগবাজার সড়ক। প্রায় তিন ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীরা সরে গেলে যান চলাচল আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে।

শেরেবাংলা বালক উচ্চ বিদ্যালয় ও আশেপাশের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মিরপুর রোডের আগারগাঁও ও শ্যামলীর সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। ফলে ওই দুই সড়কে কয়েক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে।

ফার্মগেট ওভার ব্রিজের নিচে রাস্তা বন্ধ করে অবস্থান নেন সরকারি বিজ্ঞান কলেজসহ আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। কয়েক ঘণ্টা রাস্তা বন্ধ করে রাখলেও সেখানে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

ধানমন্ডি এলাকায় অবস্থান নেন সিটি কলেজের ছাত্ররা। পরে পুলিশের তৎপরতায় শিক্ষার্থীরা রাস্তা ছেড়ে দিলে ওই এলাকার যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

মিরপুর-১ নম্বর সনি সিনেমা হলের সামনে এবং মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বরে অবস্থান নেন কমার্স কলেজ, শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। মিরপুর ১ নম্বরে শিক্ষার্থীরা কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করলেও পুলিশের তৎপরতায় ঘণ্টাখানেক পর রাস্তা থেকে সরে যায় তারা।

মিরপুর ১০ নম্বরে বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পুলিশ চড়াও হলে এক শিক্ষার্থী আহত হয়। এদিন যানবাহন শ্রমিকরা বেশিরভাগ বাস বন্ধ রাখার ফলে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী।

আজ বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে টানা তৃতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। এ সময় যথারীতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে হাতে হাতে ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ করে তারা।

সকালে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজপথে অবস্থান নেয়। ফলে ওই রাস্তা নিয়ে গাড়ি চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

ধানমন্ডির ল্যাবএইড থেকে সায়েন্স ল্যাব ও নিউমার্কেটের দিকে গাড়ি যেতে দেওয়া হয়নি। গাড়ি ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আইডিয়াল, সিটি কলেজ, ঢাকা কলেজ, গর্ভমেন্ট ল্যাবরেটির স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। ফলে আজিমপুর থেকে মিরপুরগামী রোডে যান চলাচল বন্ধ থাকে।

সায়েন্স ল্যাব থেকে শিক্ষার্থীদের একটি দলকে শাহবাগের দিকে যায়। ওই সময় শিক্ষার্থীদের পুলিশকে ফুল দিতে দেখা যায়। শাহবাগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেয়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা চালকদের লাইসেন্স পরীক্ষা করে। লাইসেন্স না থাকায় বিহঙ্গ ও সাভার পরিবহনের দুটি বাস আটকে রাখে তারা।

নিউমার্কেট এলাকায় শিক্ষার্থীদের অবরোধে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে অ্যাম্বুলেন্স দেখলেই শিক্ষার্থীদের রাস্তা খালি করে তা ছেড়ে দিতে দেখা গেছে।

উত্তরা হাউস বিল্ডিং মোড়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে। তারা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। ডেমরা মা ও মাতৃসদন শিশু হাসপাতালের সামনে স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করে। টঙ্গী সরকারি কলেজের সামনে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে।

ক্যামব্রিয়ান, রাউজকসহ বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা সকাল থেকে বিক্ষোভ করছে। তাদের একটি অংশ হেঁটে কাওলা ব্রিজ অতিক্রম করে খিলক্ষেতের দিকে গেছে। রাস্তায় কাওলা ব্রিজের সামনে একটি বাস ভাঙচুর করা হয়। ভাটারায় সড়ক অবরোধ করা হয়।

দুপুরের দিকে খিলগাঁও সরকারি ও মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল ও কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, সলিমুল্লাহ, সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীরা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। পল্টন থেকে শিক্ষার্থীদের প্রেসক্লাবের দিকে যেতে দেখা যায়। মালিবাগের দিকে চলাচলকারী সব গাড়ি মৌচাকের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। রামপুরার রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

যাত্রাবাড়ী মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করে। ফলে কাচপুরের দিকে রাজধানীরমুখী কোন বাস চলাচল করতে পারেনি। তবে রোগীবহনকারী অ্যাম্বুলেন্স ও হজ্ব যাত্রীদের গাড়ি চলাচল করে।

বনশ্রী থেকে ইমপেরিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা রামপুরা ব্রিজের দিকে রওনা দেয়। পৌনে ১২ টার দিকে বনশ্রীর আইডিয়াল স্কুল ও কলেজের ৫০০ শয়ের মতো শিক্ষার্থী রামপুরা ব্রিজ অবরোধ করে রাখে। সেখানে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

মঙ্গলবার মিরপুর ১৪ নম্বর সেকশনে শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজের এক শিক্ষার্থী পুলিশের মারধরে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় আজ বুধবার শিক্ষার্থীরা সেখানে বিক্ষোভ মিছিল বের করে।

ছাত্রবিক্ষোভের জেরে রাজধানীর প্রত্যেক রুটে বাস চলাচল একেবারে কমে গেছে। ফলে এই তিনদিনে সকালে অফিস গন্তব্যের উদ্দেশে যারা বের হচ্ছেন, তারা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। অ্যাপসভিত্তিক যানবাহন, সিএনজি অটোরিকশা ও রিকশায় করে বাড়তি ভাড়ায় অফিস যেতে হয়েছে। বিভিন্ন রুটে দুই-একটি বাস চলাচল করলেও সেগুলোতে ছিল যাত্রীদের গাদাগাদি।

এদিকে, বিভিন্ন স্কুল-কলেজে গিয়ে পুলিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখার অনুরোধ জানাচ্ছে বলে জানা গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here