অর্থনীতি

জৈব সারে বেশি ফলন খাবারও বিষমুক্ত

য়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার তালতলা বাজার। এই বাজারে একটু পর পর গাছের সঙ্গে লাগানো ছোট ছোট দু-তিনটি সাইনবোর্ড। এতে লেখা রয়েছে ‘এই গ্রামে কেঁচো সার পাওয়া যায়’। চায়ের দোকানিকে জিজ্ঞাসা করতেই জানালেন এখানে অনেক বাড়িতেই এই সার তৈরি করা হয়, যা নিজেদের চাষাবাদে ব্যবহার করার পাশাপাশি বিক্রিও করছে। বাণিজ্যিকীকরণের আশায়ই এভাবে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে।

পরে এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই এলাকায় জৈব সার উৎপাদনের কারণেই মানুষ রাসায়নিকমুক্ত ফলনে আগ্রহী হচ্ছে। কারণ এতে করে ফলন যেমন বাড়ছে তেমনি রাসায়নিকমুক্ত খাদ্যও উৎপাদন হচ্ছে।

বেশ কয়েক বছর ধরেই এলাকার মানুষ কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরি করছে। নিজেদের চাষাবাদে ব্যবহার করে ভালো ফলনও পাচ্ছে। আবার বিক্রি করেও বাড়তি কিছু আয় করছে। অন্য এলাকা থেকেও মানুষ এসে সার কিনে নিয়ে যাচ্ছে। তবে এই সার উৎপাদনের যে কাজটি সেটি শুধু নারীরাই দেখভাল করছে। যে কারণে পুরুষের পাশাপাশি গ্রামের মহিলারা পরিমাণে কম হলেও পরিবারের আয়ে ভূমিকা রাখতে পারছে।

রাস্তার পাশেই একটি বাড়িতে থাকেন আমেনা খাতুন। তিনি পাশের বাড়ির একজনের সার উৎপাদন দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেও শুরু করেছেন। তিনি জানান, সার উৎপাদনে কেঁচো ও গোবর প্রয়োজন পড়ে। কেঁচোর পরিমাণের ওপর নির্ভর করে কত দ্রুত সার উৎপাদন হবে। তবে একবার সার উৎপাদনে কমপক্ষে ১০-১২ দিন সময় লাগে। বর্তমানে তিনি প্রতি মাসে ১০০ কেজি বা তারও বেশি পরিমাণে সার তৈরি করছেন, যার প্রতি কেজি আট থেকে ১০ টাকা দামে বিক্রি করছেন। অর্থাৎ ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা আয় হচ্ছে তাঁর।

আমেনা খাতুন নিজের সবজির মাচা দেখিয়ে বলেন, ‘কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করে ফলন বেশি হচ্ছে। আর গাছে পোকার আক্রমণ নেই। সিজন অনুযায়ী বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করছি, যে কারণে বাজার থেকে কিনতেও হচ্ছে না।’

পাশের বাড়ির রাশেদা খাতুনেরও একই অবস্থা। তিনি বলেন, ‘প্রতি মাসে যে আয় হচ্ছে সেটা দিয়ে ছেলেমেয়েদের বই খাতা, জামা কিনে দেন তিনি। মাঝেমধ্যে স্বামীকেও টাকা দেন।’

কুশমাইলের এই এলাকাটিতে ওয়ার্ল্ড ভিশন এনজিও প্রথমে ২০ জন গ্রামবাসীকে সহযোগিতা করেছিল কেঁচো কম্পোস্ট সার উৎপাদনে। প্রশিক্ষণ দেওয়া থেকে শুরু করে কেঁচো ও সার বানানোর পাত্র সরবরাহ করেছিল তারা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষগুলো তাদের আয় বাড়িয়ে ছেলেমেয়ের বাড়তি যত্ন নেবে। সে ধারণা থেকেই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তারা। তবে তারা যাদের সহযোগিতা করেছে তাদের মধ্য দিয়েই এখন বেশির ভাগ মানুষ এই সার উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে।

এ বিষয়ে এনজিওটির এপির ম্যানেজার জেম্স বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা তাদের মূল পেশা নয়। বাড়তি আয় করার একটি পথ মাত্র। বাড়তি আয়ের কারণে পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের বাড়তি পুষ্টি ও প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে পারছে। শুধু সার তৈরিতেই নয়, কোথায় তারা বিক্রি করবে সে যোগাযোগটাও আমরাই তৈরি করে দিচ্ছি।’ একইভাবে এই এলাকার ৫০টি পরিবারের নারীরা কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরি করে নিজেদের চাষাবাদে ব্যবহারের পাশাপাশি বিক্রি করে আয় করছে। অনেক দূর থেকেও মানুষ এসে সার নিয়ে যাচ্ছে।

ফুলবাড়িয়া উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুলতান মল্লিক বলেন, প্রথম দিকে এই কাজটি করতে গ্রামের মানুষ অনীহা প্রকাশ করত। কিন্তু এখন তারা নিয়মিতই করছে। একজনের দেখাদেখি অন্যরা শুরু করেছে। কারণ এটা শুধু তারা বিক্রিই করছে না, নিজেদের ফলনও ভালো পাচ্ছে। মাটিতে হারিয়ে যাওয়া জৈব পদার্থের বড় ঘাটতি পূরণে সহায়তা করছে কেঁচো কম্পোস্ট। মানুষও চাষাবাদে ধীরে ধীরে এর ব্যবহার বাড়াচ্ছে।

কেউ যদি এই সার নিজেরা উৎপাদন করতে চায় তবে সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানান তিনি। কারণ যে কেঁচোতে এই সার তৈরি হয় সেটা সাধারণ মাটির কেঁচো নয়। কোথায় পাওয়া যাবে এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা তথ্য দিতে পারবেন।

এই উপজেলার কুশমাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. শামসুল হক বলেন, ‘এটা একটা পরিবর্তন। ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষ এই জৈব সারের ব্যবহার বাড়াচ্ছে, কারণ তারা চাষাবাদে সুফল পেতে শুরু করেছে। স্থানীয় কৃষকদের এই সার ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করছি।’

এ ছোট কাজটি চাষাবাদের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ষাটের দশকে এ দেশে কৃষিজমির উর্বরতা বৃদ্ধি বা ধরে রাখতে ব্যবহার করা হতো জৈব সার। বাড়তি ফলনের আশায় ধীরে ধীরে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে নানা প্রকারের কীটনাশক। ফলন বাড়লেও খাবারের মান নিয়ে মানুষের মনে তৈরি হয়েছে নানা সংশয়। যে কারণে এখন আবার সারা দেশের মানুষ অল্প অল্প করে হলেও অর্গানিক চাষাবাদের দিকে ঝুঁকছে। অর্থাৎ পুরনো জামানায় ফিরে যেতে চাইছে। কেঁচো কম্পোস্ট সার এই যাত্রাকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তাঁরা। কারণ অর্গানিক চাষাবাদের বড় শর্তই হলো জমিতে জৈব সারের ব্যবহার।

ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মো. আশরাফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাটিতে জৈব পদার্থ থাকা উচিত কমপক্ষে ৫ শতাংশ। যেখানে দেশের ৬০ শতাংশ কৃষিজমিতে এর পরিমাণ নেমে এসেছে ২ শতাংশের নিচে। এর মধ্যে বড় একটি অংশে তা ১ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে। অতিমাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহার, জৈব সার ব্যবহার না করা, একই ফসল প্রতিনিয়ত চাষ করা এর বড় কারণ। সেখানে কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করলে মাটির প্রয়োজনীয় ১৭টি পুষ্টির মধ্যে ১২টির বেশি মাটিতে প্রবেশ করে। উর্বরতা বাড়াতে এর চেয়ে ভালো জৈব সার পাওয়া দুষ্কর।’

নিজের একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি জমিতে ৭৫ শতাংশ জৈব সার ও ২৫ শতাংশ অন্য রাসায়নিক সার ব্যবহার করে আমরা দেখেছি যে ফলন বেড়ে গেছে ১৫-২০ শতাংশ। সুতরাং জৈব সার ব্যবহার করেও বাড়তি ফলন সম্ভব। এসব কারণেই মানুষ এখন আবার অর্গানিক চাষাবাদে ঝুঁকতে শুরু করেছে। সারা দেশে ছোট ছোট করে শুরু হয়েই একটা বড় পরিবর্তনের আশা দেখছি। যেখানে আমরা একটা সময়ে ছিলাম, সেখানেই যাওয়ার জন্য যাত্রা শুরু করেছি।’