আইন আদালত

জামিনে ভোগান্তি কমাতে ঢাকার সিএমএম কোর্টে নয়া নিয়ম চালু

ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে কোনো আসামির জামিন হওয়ার পর আইনজীবীর জামিননামা দাখিল এবং বিচারকের সই হওয়ার মধ্যে পুলিশের আর কোনো ভূমিকা থাকছে না; এর ফলে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমবে বলে আশা করছেন আইনজীবীরা।

কোনো ফৌজদারি মামলায় আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ার আগে বিচারক আসামির জামিন মঞ্জুর করলে আইনজীবীর জামিননামা দাখিল করতে হয় পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা শাখায়। সেখানে পাঁচটি ধাপে জামিন আদেশ তৈরি করে পাঠানো হয় বিচারকের কাছে। বিচারকের সই হওয়ার পর সেই আদেশ কারাগারে পাঠালে মুক্তি মিলত বিচারপ্রার্থীর।

আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা বলছেন, এই কাজে সাধারণ নিবন্ধন শাখায় প্রতিটি ধাপ পার হতে পুলিশকে ‘খরচাপাতি’ দিতে হত। তাতে বিচারপ্রার্থীকে পোহাতে হত ভোগান্তি।

ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম মো. সাইফুজ্জামান হিরো গত ১২ সেপ্টেম্বর পুরনো ওই প্রক্রিয়া বাতিল করে দিয়েছেন। তিনি নতুন যে নিয়ম চালু করেছেন, তাতে যে বিচারক জামিন দেবেন, সেই আদালতের সাঁটলিপিকারের মাধ্যমে জামিননামা দাখিল করতে হবে।

সাঁটলিপিকার নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া শেষে বিচারকের কাছে জামিন আদেশ পাঠাবে স্বাক্ষরের জন্য। এই প্রক্রিয়ায় আর পুলিশের সংশ্লিষ্টতা থাকবে না।

বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা মুখ্য মহানগর হাকিমের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও আদালত পুলিশের কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

ঢাকার হাকিম আদালতে প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক আসামির জামিন হয় জানিয়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সাঈদুর রহমান মানিক বলেন, মহানগর দায়রা জজ আদালতেও জামিননামার কাজ হয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) ও সাঁটলিপিকারের মাধ্যমে।

“সেখানে জামিননামা জমা দেওয়ার পর হাকিম আদালতের মত এতগুলো ধাপ পেরোতে হয় না। পুলিশের কোনো ভূমিকা নেই বলে বিচারপ্রার্থীকে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় তুলনামূলকভাবে কম। হাকিম আদালতেও এ রকম নিয়ম করায় আমরা সবাই খুশি।”

আইনজীবী মাহবুব হাসান রানা গণমাধ্যমকে বলেন, “ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের এ উদ্যোগে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা পুলিশের কবল থেকে রক্ষা পেল। আইনজীবীদের মধ্যে এমন কাউকে আমি পাইনি যিনি এ উদ্যোগকে ভালো মনে করছেন না। পুলিশ বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে ঘাটে ঘাটে টাকা নিত। সেটা এখন বন্ধ হল।”

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ, তথ্য ও প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ আনিসুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, “এটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। এর ভালো মন্দ বিষয়ে আমার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।”

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী পারভেজ হাসেম বলেন, “এ আদেশে একটি শ্রেণি নাখোশ হতে পারে, কিন্তু এ পদক্ষেপ বিচার প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি কমানোর প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করবে বলে আমার বিশ্বাস।”

বিচার প্রক্রিয়ার গতি বাড়াতে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আরও একটি উদ্যোগ নিয়েছেন। এর ফলে জিআর (জেনারেল রেজিস্ট্রার মামলা- থানায় যে মামলা করা হয়) এবং সিআর মামলার (নালিশি/পিটিশন মামলা/কমপ্লেইন রেজিস্ট্রার মামলা- যে মামলা থানায় না করে সরাসরি আদালতে করা হয়) বিচার আরও দ্রুত শুরু করা সম্ভব হবে বলে আইনজীবীরা মনে করছেন।

সিআর মামলায় আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করলে নতুন নিয়মে সংশ্লিষ্ট হাকিম অর্থাৎ ওই আমলী আদালতের বিচারকই তিন দিনের মধ্যে মুখ্য মহানগর হাকিমের কাছে নথিপত্র পাঠিয়ে দেবেন।

আর মুখ্য মহানগর হাকিম ওই নথি হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন মহানগর হাকিমকে বিচারের জন্য নির্দিষ্ট করে মামলায় বিচার শুরুর তারিখ নির্ধারণ করে দেবেন।

আইনজীবীরা বলছেন, এ ব্যবস্থা ঠিকভাবে কার্যকর হলে মামলার নথিপত্র আর ড্রয়ারে অথবা আলমারিতে পড়ে থাকবে না। ফাইল চলবে সময়ের নিয়ম ধরে।

জিআর মামলায় পুলিশের কাছ থেকে তদন্ত প্রতিবেদন (অভিযোগপত্র/ চূড়ান্ত প্রতিবেদন) পাওয়ার পরও আমলী আদালতের বিচারক (মহানগর হাকিম) একইভাবে তিন দিনের মধ্যে মুখ্য মহানগর হাকিমকে নথি পাঠিয়ে দেবেন। মুখ্য মহানগর হাকিম দ্রুত কোনো মহানগর হাকিমকে বিচারের ভার দিয়ে বিচার শুরুর তারিখ ঠিক করে দেবেন।

আর বিচারের ক্ষমতা যদি দায়রা আদালতের হয়, সেটিও দ্রুত ওই আদালতে পাঠিয়ে দেয়া হবে। এতে করে বিচার শুরুর দীর্ঘসূত্রতা কিছুটা হলেও কমবে বলে আইনজীবীদের প্রত্যাশা। বিডিনিউজ