অর্থনীতি

খরচে সমান, মজুরিতে আকাশ-পাতাল

তিন বেলা কোনো রকম খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন শ্রমিকের ন্যূনতম যে খরচ হয়, একই ধরনের খরচ হওয়ার কথা বেসরকারি খাতের শ্রমিকেরও। কিন্তু দুটি খাতের মজুরিতে রয়েছে আকাশ-পাতাল বৈষম্য।

উভয়কে সামাজিক নিরাপত্তা দেয় যে সরকার, তার করা আইনেও রয়েছে এই বৈষম্যের প্রকাশ! সরকারি খাতের শ্রমিকদের জন্য যে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়, একই খাতের বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের জন্য সরকার মজুরি নির্ধারণ করে দেয় তার তুলনায় অনেক কম। এ ছাড়া বেসরকারি শ্রমিকের মজুরি পুনর্নির্ধারণেও উদাসীনতা দেখানো হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের পাঁচ বছর পর পর মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হলেও বেসরকারি এমন অনেক খাত আছে, গত ৩৫ বছরেও যে খাতে পুনর্নির্ধারণ করা হয়নি মজুরি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সরকারি শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করে জাতীয় মজুরি এবং উৎপাদনশীলতা কমিশন। বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের জন্য মজুরি নির্ধারণ করে সরকারের নিম্নতম মজুরি বোর্ড। ৪২টি  বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের জন্য মজুরি নির্ধারণ করেছে এ প্রতিষ্ঠান। তবে সরকারি ও বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে ব্যবধান রয়েছে আকাশ-পাতাল। তাঁরা জানান, একই

মানের জীবনযাপনে  শ্রমিকদের কারো বেতন ১৬ হাজার টাকা আবার কারো বেতন চার হাজার টাকা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কাজের ধরন ও ঝুঁকির ফলে মজুরির কিছুটা তারতম্য হতে পারে। কিন্তু একেবারে আকাশ-পাতাল বৈষম্য হওয়াটা অন্যায়।

গত সোমবার মন্ত্রিপরিষদ রাষ্ট্রীয় কারখানার শ্রমিকদের ন্যূনতম মূল মজুরি আট হাজার ৩০০ এবং সর্বোচ্চ ১১ হাজার ২০০ টাকার ঘোষণা দেয়। বাড়িভাড়া, মেডিক্যাল সুবিধাসহ এ মজুরি ১৬ হাজার টাকার কাছাকাছি। অন্যদিকে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সর্বশেষ হাল নাগাদ তথ্য অনুসারে বস্ত্র খাতের শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে তিন হাজার ৬০০ টাকা (মূল মজুরি)। অন্যান্য সুবিধাসহ মোট মজুরি মাত্র পাঁচ হাজার ৭১০ টাকা। ২০১৫ সালের ১ জুলাই থেকে রাষ্ট্রীয় কারখানার শ্রমিকদের নতুন মজুরি এবং ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে ভাতা কার্যকর করা হবে। এর আগে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানায় ন্যূনতম মজুরি ছিল চার হাজার ১৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ৬০০ টাকা। জাতীয় মজুরি এবং উৎপাদনশীলতা কমিশন গত বছরের জুলাইয়ে এই নতুন মজুরির সুপারিশ করে।

তেজগাঁও শিল্প এলাকার কোর স্পুন অ্যাপারেল লিমিটেডের সাবেক শ্রমিক মানারাত বেগম মনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এক কেজি মোটা চাল কিনতে গেলে আমাকে ৫০ টাকা দিতে হয়, সরকারি কারখানার যে শ্রমিক ওই চাল খায় তাকেও দিতে হয় ৫০ টাকা। অথচ সরকারের মজুরি বোর্ড আমাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে তিন হাজার টাকা। আর সরকারি ওই শ্রমিকের মূল মজুরি আট হাজার ৩০০ টাকা। এমন বৈষম্য যখন সরকারই তৈরি করে তখন অসহায় শ্রমিকদের আর কিছু বলার থাকে না।’

মনি জানান, গত কয়েক বছরে তাঁর কোনো আয় বাড়েনি। জিনিসের দাম প্রতিবছরই বাড়ছে। বাজারে কোনো জিনিসে হাত দেওয়া যায় না। ফলে তাঁকে সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে অনাহার-অর্ধাহারে থাকতে হয়। মজুরি বাড়ানোর জন্য দাবি করলে সরকার-মালিক সবাই মিলে নির্যাতন করে। চাকরি হারাতে হয়। না হয়, জেলে যেতে হয়। তিনি বলেন, ‘একই দেশে সরকারের শ্রমিকের জন্য এক আইন আমাদের জন্য আরেক আইন। তাই আমার দাবি, একটি পরিবারে কী পরিমাণ ন্যূনতম খরচ হয়, সেই হিসাব ধরে নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হোক। কাজের ঝুঁকি বা দক্ষতা হিসেবে আলাদা ভাতা দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ন্যূনতম মানদণ্ডে যেন কোনো পার্থক্য না হয়।’

এদিকে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের ওয়েবসাইটে ৪২টি খাতের সর্বশেষ মজুরি পুনর্নির্ধারণ করে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যায় সর্বশেষ চলতি বছরে বস্ত্র খাতের মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এ খাতের শ্রমিকদের মূল মজুরি ধরা হয়েছে তিন হাজার ৬০০ টাকা। আর অনেক খাতে গত ৩৫ বছরেও মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়নি। এমন একটি খাত হলো ‘পেট্রল পাম্প শ্রমিক’। ১৯৮৭ সালে পেট্রল পাম্প শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল মূল ৫৬০ টাকা, মোট ৭৯২ টাকা। এটা এখনো বহাল।

নীতিগত ও আইন বৈষম্যের অভিযোগ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরো জানান, সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার শ্রমিকদের জন্য নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ বছর পর পর মজুরি পুনর্নির্ধারণ করে। বেসরকারি ৪২টি খাতের মজুরি নির্ধারণ করা হয় সরকারের মর্জিমাফিক বা শ্রমিকরা আন্দোলনে গেলে। আবার অপ্রাতিষ্ঠানিক অনেক খাতের জন্য করাই হয় না।

শ্রমিকদের নিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রায় ছয় কোটি ৭৫ লাখ শ্রমিক রয়েছে। এর মধ্যে এক কোটি ২৫ লাখ প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকের জন্য এ পর্যন্ত ৪৩টি খাতে ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি অর্ধশতাধিক খাতের জন্য ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নেই। সর্বশেষ বস্ত্র খাতের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয়।

বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের বিশাল শ্রমিকগোষ্ঠী এখনো মজুরি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। নির্ধারিত খাতের বাইরে ৮০ শতাংশ শ্রমিক রয়েছে, যাদের কোনো নির্ধারিত মজুরি নেই। সুতরাং দেখা যায়, সরকারের আইনেই মজুরি বৈষম্য আছে। এমনকি একই কারখানার ভেতরেই মজুরি বৈষম্যর অনেক ফারাক রয়েছে। একজন প্রডাকশন ম্যানেজার কিংবা মানবসম্পদ উন্নয়ন কর্মকর্তা ন্যূনতম মজুরি পান ৩০ হাজার টাকা। এই বেতন আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত হয়। অন্যদিকে শ্রমিকের বেতন তিন হাজার থেকে ১৩ হাজার টাকা।

সরকারি শ্রমিকদের বিষয়ে সুলতান উদ্দিন বলেন, সরকারি কারখানার শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ধরা হয়েছে আট হাজার ৩০০ টাকা। এটা তাদের মূল মজুরি। অন্যান্য সুবিধাসহ এটা প্রায় ১৬ হাজার টাকায় যাবে। তাদের জন্য আবাসন, যাতায়াত, শিক্ষা ভাতা, চিকিৎসা খরচ থাকলেও বেসরকারি শ্রমিকদের এই সুবিধা নেই বললেই চলে। অন্যদিকে সরকারি শ্রমিকরা দুটি মূল বেতনের সমান হিসেবে গ্র্যাচুইটি পায়। কিন্তু অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে এটা কেউ দেয় আবার কেউ দেয় না।

রাষ্ট্রায়ত্ত শ্রমিকদের জন্য ঘোষিত মজুরি বেশ যৌক্তিক উল্লেখ করে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান বলেন, সরকারি শ্রমিকরা বাসস্থান, চিকিৎসা ও সন্তানের লেখাপড়ার সুবিধা এবং চাকরি শেষে নিরাপত্তা হিসেবে গ্র্যাচুইটি এবং পেনশন সুবিধা পেলেও বাতির নিচে অন্ধকারের মধ্যে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা অবস্থা। কিছু কিছু খাতে মজুরি কাঠামো থাকলেও পায় না অন্য সব সুবিধা।

ওয়াজেদুল ইসলামের বলেন, ‘সরকারি শ্রমিকরা গ্র্যাচুইটিসহ বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা পেলেও খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য এটা কম। তিনজনের একটি পরিবারের জন্য কমপক্ষে ১৮ হাজার টাকার কমে হয় না। আমরা তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ১৬ হাজার টাকা দাবি করেছি। সরকারি শ্রমিকদের জন্য যে বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে তার ভিত্তিতে বলা যায়, পোশাক খাতের যে ন্যূনতম মজুরি আমরা দাবি করেছি সেটা যৌক্তিক। আমাদের আশা, সরকার যেন একটি মজুরির ক্ষেত্রে একটি জাতীয় মানদণ্ড ঘোষণা করে। এর ভিত্তির ওপর জীবনযাত্রার মান, ওপর ও নিচের মজুরি আনুপাতিক হারে নির্ধারণ করে। মজুরি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িভাড়া ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়।’ এ জন্য তিনি সরকারের নজরদারি বাড়ানো দরকার।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারি কারখানাগুলোর মজুরি বাড়ানো যৌক্তিক হলেও সরকারি করপোরেশনগুলোতে এখন অনেক দায় আছে। কোনো কোনো কারখানায় নিয়মিত বেতন-ভাতা দিতে পারে না। বকেয়া বেতনের জন্য আন্দোলন হয়। তাই অন্য দায় বিবেচনায় নিয়ে করা হলে নতুন মজুরি আরো কার্যকর হতো। তিনি আরো জানান, নতুন মজুরি ঘোষণার ফলে পূর্বে ঘোষিত যে মজুরি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি সে ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে। এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় আরো বেড়ে যাবে। কেননা এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো এখনো লোকসানি প্রতিষ্ঠান। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যয় মেটানোর দিকনির্দেশনাও থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here