রাজনীতি

একানব্বইয়ের পথেই হাঁটছে আ. লীগ?

ভুবনবাংলা২৪ঃ রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে গত তিন ধরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বিক্রি  করছে। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ব্যান্ড পার্টি, সানাই, ব্যানার ফেস্টুন, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, পিকআপ গাড়ি নিয়ে দলে দলে মিছিল সহকারে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করছেন। এমন অবস্থা দেখে অনেকের মনে হতেই পারে যে, এই নির্বাচন একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। নির্বাচন হলেই আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসবে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতারাও বলছে, যে কোন উপায়ে আওয়ামী লীগের একটা নির্বাচন করার টিকিট পেলেই কেল্লাফতে। তাঁরা নিশ্চিত যে তাঁরা এমপি হবে এবং এরপর দেন-দরবার করে মন্ত্রীও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং ২০ দলীয় জোট ভোট করার ঘোষণা দিল, তখনো কি ভোটের হিসেব নিকেশ একই রকম থাকবে, সেই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে।

আওয়ামী লীগের আত্মবিশ্বাস বর্তমানে অতি আত্মবিশ্বাসে রূপ নিয়েছে। তাঁরা ধরেই নিয়েছে যে, আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসবে। আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতারা মনে করছেন, যেকোনো ভাবে একটা মেকানিজম বা যাই হোক না কেন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় থেকে নামাতে পারবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগের এই বডি ল্যাংগুয়েজ, আওয়ামী লীগের এই অতি আত্মবিশ্বাস, আওয়ামী লীগ নেতাদের মনোনয়ন পাওয়ার মরণপণ লড়াই দেখে অনেকের দৃশ্যপটে ১৯৯১ সালের স্মৃতি ভেসে উঠছে।

নব্বই সালে গণ আন্দোলনে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন হয়। স্বৈরাচার এরশাদ পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর সবাই ধরেই নিয়েছিল যে, বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে নির্বাচন হয়, সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় একটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। তখন বিএনপি ছিল একটা অগোছালো দল। সেই নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ টি আসনে প্রার্থী পর্যন্ত যোগাড় করতে পারে নাই। বিএনপি ২৯২ টি আসনে প্রার্থী দিতে পেরেছিল। অনেক আসনে তাঁরা চেয়ে চিনতে প্রার্থী দিয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দুই সচিব প্রয়াত কেরামত আলি এবং প্রয়াত এমকে আনোয়ার, একজন ছিলেন কেবিনেট সচিব আরেকজন ছিলেন জনপ্রশাসন সচিব। এরশাদের ঘনিষ্ঠ থাকায়, এরশাদের পদত্যাগের পর তাঁদের দুজনকেও পদত্যাগ করতে হয়। পদত্যাগের পর তখন ‘আরপিও’ও তে নিয়ম ছিল না যে, তিন বছরের মধ্যে নির্বাচন করতে পারবে না। তখন এই দুই সচিব নিজেদের গাঁ বাঁচানোর জন্য আওয়ামী লীগের দরজায় টোকা দিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘যেহেতু তিন জোটের রূপ রেখার  মধ্যে আছে যে, এরশাদের সহযোগীকে নেওয়া হবে না, আপনারা এরশাদের সহযোগী কাজেই আমি আপনাদেরকে নিতে পারবো না। আওয়ামী লীগের অনেক ক্যান্ডিডেট তাই বাইরের লোকের নেওয়ার কোনো সুযোগ নাই।’ এরপর তাঁরা গেল বিএনপিতে। বিএনপি তখন ঐ এলাকাগুলোতে কোনো প্রার্থী খুঁজে পাচ্ছিল না। প্রার্থী খুঁজে না পাওয়ার কারণে তাঁদের দুজনকেই মনোনয়ন দেওয়া হল। তাঁরা দুজনই বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হলেন এবং মন্ত্রী হলেন। একানব্বই সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়ার সময় বিরোধ এবং অন্তঃকলহের সূচনা হয়েছিল। সে সময় প্রতি আসনে গড়ে ৫/৭ জন মনোনয়ন কিনেছিল। মনোনয়ন পত্র কেনার পর তাঁরা তাঁদের এলাকায় নিজেদের মত করে শোডাউন করেছিল। সেই সময় পুরো দল নিজদের মধ্যেই বিভক্ত হয়ে পরেছিল। এরপর যখন নির্বাচনের হয়েছিল, তাঁরা সেই বিভক্তি কাটিয়ে উঠতে পারে নাই  এটা একানব্বই সালে নির্বাচনে পরাজয়ের এক নম্বর কারণ।

নব্বইয়ের নির্বাচনে পরাজয়ের দুই নাম্বার কারণ হলো, সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ধরেই নিয়েছিল তাঁরা নির্বাচনে জয়ী হবেন। নির্বাচনের পর তাঁরা কে কোন মন্ত্রণালয়য় নিবে সেই ভাগ বাটোয়ারা করার চেষ্টা করেছিল। তাঁরা নির্বাচনে বিষয়ে মনযোগী না হয়ে, ক্ষমতায় গিয়ে কে কি করবে এটা নিয়ে তাঁরা ব্যস্ত ছিল।

পরাজয়ের তৃতীয় কারণ হল, পতিপক্ষকে আওয়ামী লীগ চরম অবমূল্যায়ন করেছিল। তাঁরা মনে করেছিল তাঁরা কোনো ভাবেই জিততে পারবে না।

সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা মানুষের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেন নাই। প্রতিটা ভোটার যে মূল্যবান, ভোটের ক্ষেত্রে জনগণই যে প্রকৃত ক্ষমতাবান এই বোধটা তাঁদের মধ্যে লোপ পেয়েছিল। এ কারণে একানব্বইয়ের নির্বাচনে একটা বিস্ময়কর ফলাফল হয়েছিল। জনগণ নীরব ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করেছিল। ঐ নির্বাচনে অভাবনীয় ভাবে বিএনপি জয়ী হয়েছিল।

বর্তমানে আমরা যদি ২০১৮ সালের প্রেক্ষাপট মিলিয়ে দেখি, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা যেভাবে ট্রাক, বাস, পিকআপ ভাড়া করে জন ভোগান্তির সৃষ্টি করে মনোনয়নপত্র কিনছেন, গড়ে প্রতি আসনে প্রায় ১৭ জন করে মনোনয়নপত্র কিনছেন। তাহলে আওয়ামী লীগের কি মনোনয়নের বিষয়ে নূন্যতম কোনো কাজ হয় নাই মনোনয়ন বিষয়ে? আমরা যতটুকু জানি আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কমিটি, উপজেলা কমিটি, জেলা কমিটি আছে, এই  কমিটিগুলো নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে কে কে মনোনয়নপত্র কিনবেন সেই সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা। যে নির্বাচনকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কঠিন চ্যালেঞ্জের নির্বাচন বলছে। যে নির্বাচনকে তাঁদের দলের সভাপতি বলছে, এই নির্বাচন আমাদের জন্যে অগ্নি পরীক্ষা, সেই নির্বাচনে কেন একেকটা আসন থেকে ১৭/১৮ জন করে প্রার্থী হবে। এটাতো আওয়ামী লীগের জন্য ভালো লক্ষণ না। বরং তাঁরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে নিজেরা বসে ঠিক করতো আমাদের দিক থেকে উনি প্রার্থী, আমাদের পক্ষ থেকে অমুকজন প্রার্থী, সেইটা তাহলে একটা শোভনীয় বিষয় হতো। একেক আসনে এতজন মনোনয়ন কেনা এটা একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের নিজেদের মধ্যে যে বিতর্ক, বিরোধিতা বা প্রতিযোগিতা তা হবে ঘরের ভিতরে আলোচনার টেবিলে। এভাবে মনোনয়ন ফরম কিনে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আওয়ামী লীগের একজন আরেকজনকে ধরাশায়ী করতে ব্যস্ত। নির্বাচনের মাঠে গিয়ে তাঁরা কি বলে জনগণের কাছে ভোট চাইবে, বিরোধী দলের বিরুদ্ধে কি বলবে, কাদের যোগ্যতার কথা তুলে ধরবে সেই বিষয়ে কারোও কোনো মাথা ব্যথা নেই। বরং তাঁরা আওয়ামী লীগের একজন প্রার্থী আরেক প্রার্থীর দোষ খুঁজে বের করতে ব্যস্ত দেখা যাচ্ছে। যার ফলে ভোটের মাঠে জনগণ একটা ভুল বার্তা পাচ্ছে। একে অপরের বিরুদ্ধে প্রচার প্রচারণার ফলে দেখা যাচ্ছে যেই পরবর্তীতে নমিনেশন পাক না কেন, তাকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পরতে হবে।

আওয়ামী লীগের নেতারা ধরেই নিয়েছে যে তাঁরা নির্বাচনে জিতে যাচ্ছে এবং তাঁরা আবার ক্ষমতায় যাচ্ছে। ক্ষমতায় গিয়ে কে কোন মন্ত্রণালয়ে যাবে, কাকে কোন দায়িত্ব দেওয়া হবে এসমস্ত বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকতে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যার ফলে আওয়ামী লীগের যারা দীর্ঘদিনের নেতা, যারা আওয়ামী লীগের দুর্দিন এবং খারাপ সময়ে ছিল, তাঁরা মনে করছে আওয়ামী লীগ কি একানব্বই সালের মত ভুল করছে। শুধু একানব্বই সালেই নয় ২০০১ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের এই প্রবণতাগুলোই দেখা গিয়েছিল। তখন আওয়ামী লীগ প্রথম রাজনৈতিক দল হিসেবে ক্ষমতা ছেড়ে নির্বাচন দিয়েছিল, আওয়ামী লীগ মনে করেছিল প্রশাসন তাকে সহযোগিতা করবে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও সহযোগিতা করবে। কিন্তু যখন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়। তখন দেখা গেল প্রশাসন আওয়ামী লীগের পক্ষে নাই। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আওয়ামী লীগের পক্ষে নাই এবং সমগ্র দৃশ্যপট পরিবর্তন হয়ে যায় সে সময়। আওয়ামী লীগ যদি ১৯৯১ সাল এবং ২০১১ সাল থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই, এই নির্বাচন যে তাঁদের জন্যে কঠিন চ্যালেঞ্জের নির্বাচন, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন তা যদি মাথায় না নেয়, তাহলে তা আওয়ামী লীগের জন্য খুব ভাল পরিণতি অপেক্ষা করবে না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই সত্যি যে একমাত্র আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ছাড়া কারও মধ্যে এই উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং তাগিদ আমরা এখন পর্যন্ত দেখছিনা। সুত্রঃ বাংলা ইনসাইডার