বিনোদন

একজনের ফিরিয়ে দেওয়া ছবি করে সুপারস্টার হয়েছিলেন আরেকজন

চলচ্চিত্রের এটি খুব পরিচিত ঘটনা। প্রতিষ্ঠিত নায়ক- নায়িকারা নানা কারণে ছবি ছেড়ে দেন। সুযোগ পেয়ে যায় নতুন কেউ। দেখা যায়, সেই সুযোগই ভাগ্য খুলে যায় তার। বনে যান তারকা।

রহমানের ছবিতে রাজ্জাক:

নায়ক রাজ রাজ্জাকের কথাই ধরা যাক। সেই ১৯৬৬ সালের কথা। জহির রায়হান সিদ্ধান্ত নিলেন হিন্দু পুরাণ মনসামঙ্গল কাব্যের বেহুলা-লখিন্দর উপাখ্যান নিয়ে ছবি বানাবেন। প্রযোজকের পছন্দ রহমান। রহমান তখন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে সমান জনপ্রিয়। কিন্তু গল্প শুনে না করে দিলেন। এমন জনপ্রিয় নায়ক ছবির অর্ধেক সময় ভেলায় শুয়ে থাকবেন! রহমানের না করাতে বিপদে পড়লেন পরিচালক। হঠাৎ নায়ক কোথায় পাবেন! শুটিং ডেটও তো প্রায় ঠিক হয়ে আছে। হঠাৎ মনে পড়ল রাজ্জাকের কথা। অভিনেতা খলিল এবং প্রযোজক ইফতেখারুল আলম রাজ্জাককে পছন্দ করতেন। কয়েকবার দেখেছেন ছেলেটাকে। সুযোগের অপেক্ষায় ঘুরছেন ওপার বাংলা থেকে এসে। সেটাও জানা। ছবিতে রাজ্জাকের অভিনয় প্রশংসিত হয়। ‘বেহুলা’র আগে ছোট চরিত্রে কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছেন। কিন্তু এই ছবি করে রাতারাতি রহমানেরই প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে গেলেন রাজ্জাক।

শাকিবের ছবিতে বাপ্পী:
পরিচালক জুটি শাহীন সুমন জুটিকে নিয়েই ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখে জাজ মাল্টিমিডিয়া। তারা তিনটি ছবি করবে পরপর। পরিচালক সমিতিতে ছবিগুলোর নাম নিবন্ধনও হয়-‘ভালোবাসার রং’,‘অন্যরকম ভালোবাসা’ ও ‘ভালোবাসা আজকাল’। শুরুতে সবকটি সিনেমায় অভিনয়ের কথা ছিলো শাকিব খানের। অগ্রিম পারিশ্রমিকও পেয়েছিলেন শাকিব। প্রথম ছবি ‘ভালোবাসার রং’- এর গান ও গল্প তৈরীর পর যোগাযোগ হয় শাকিব খানের সঙ্গে। কিন্তু কোনমতেই শাকিব শিডিউল দিতে পারছিলেন না। ২০১১ সালের শিডিউল আগেই বুক করা। প্রযোজক অপেক্ষা করতে নারাজ। শাকিব অনুরোধ করলেন অন্য কাউকে নিয়ে কাজ করতে।

শুরু হলো নতুন মুখ খোঁজা। শত শত ছেলে- মেয়ের সপ্তাহব্যাপি অডিশন নিয়ে বাপ্পী ও মাহিকে সিলেক্ট করা হলো। প্রথম ছবি ‘ভালবাসার রঙ’ মুক্তির পর হিট। রাতারাতি তারকা বনে গেলেন বাপ্পী। একাধিক ছবির অফার পেতে শুরু করলেন।

রিয়াজের ছবিতে শাকিব:
২০০৪ সালের কথা। ত্রিভুজ প্রেমের গল্প নিয়ে ‘আমার স্বপ্ন তুমি’ বানাবেন হাসিবুল ইসলাম মিজান। ফেরদৌস আর শাবনূর আগেই রাজি হলেন। রিয়াজকে সে ছবিতে নেয়ার কথা চলছিলো। কিন্তু শাবনুর রিয়াজকে এড়িয়ে গেলেন। তখন তাদের দ্বন্ধ চলছিলো। মিজান অনেক বুঝিয়ে শাবনুরকে রাজি করালেন। এমন ঘটনা শুনে রিয়াজ বেকে বসলেন। সাফ জানিয়ে দিলেন তিনি ছবিটা করছেন না। বিপাকে পড়লেন পরিচালক। কাকে নেবেন? তখন ইন্ডাস্ট্রিতে ত্রিভুজ প্রেমের ছবি করার মতো রিয়াজ- ফেরদৌস ছাড়া আর আছে শাকিল খান। কিন্তু শাকিল খানের ক্যারিয়ার তখন ভালো যাচ্ছিল না। মিজানের সহকারী বললেন শাকিব খানের কথা। পাঁচ বছর অভিনয়ে, তবু তারকা খ্যাতি পাচ্ছিলেন না। আমিন খান, আলেকজান্ডার, শাহীন আলমদের সঙ্গে কাজ করে বেশ কিছু হিট ছবি উপহার দিলেও সাফল্যের কৃতিত্ব পাননি। মিজান শাবনূরকে জানালেন শাকিবের কথা। শাবনূর হ্যা বলে দিলেন। আর বললেন ,‘ওর মধ্যে চেষ্টা আছে। ও ভালো সুযোগ পেলে অনেকদূর যাবে।’ মিজান শাকিবকে জানালেন। শাকিব জানালেন,‘টাকা পয়সা কোন ব্যাপার না। এমন তারকা সমৃদ্ধ ছবিতে কাজ করতে পারবো সেটাই অনেক।

শাকিব
শুরু হলো শুটিং। সবাইকে তাক লাগিয়ে অভিনয় করলেন শাকিব। ডাবিং করার সময় পুরো ছবি দেখে শাবনূর মুগ্ধ। তিনি পরিচালককে বললেন,‘এই ছবির পর শাকিব সুপারস্টার হয়ে যাবে।’ সত্যিই এমনটা হলো। যখন ছবিটি মুক্তি পেল। সব হিসেব বদলে গেল। পাল্টে গেল শাকিবের ভাগ্য। দর্শক দারুনভাবে গ্রহণ করলো শাকিবকে।

নাঈমের ছবিতে ওমর সানী:
নাঈম- শাবনাজ তখন সুপারহিট জুটি। শেখ নজরুল ইসলাম তাদের নিয়ে ‘চাঁদের আলো’ ছবি নির্মাণ করতে চাইলেন। চিত্রনাট্য প্রস্তুত, শুটিংয়ের তারিখও চূড়ান্ত। সিনিয়র প্রযোজক ও পরিচালক দারাশিকো নজরুলকে তার অফিসে ডাকলেন। ওমর সানী অফিসে বসা। দারাশিকো সানীকে দেখালেন। সানী মন খারাপ করে বসে আছে। নজরুলকে বসতে বললেন দারাশিকো। তারপর সানীকে দেখিয়ে বললেন, ‘নজরুল, এই ছেলেকে নিয়ে ‘সুজন বাঁশি’ ছবি শুরু করেছিলাম। কয়েক দিন শুটিংও হয়। কিন্তু তোজাম্মেল হক বকুলের কথায় ছবিটি বন্ধ করে দিলাম। বকুলকে দিয়ে ‘দিলরুবা’ বানিয়ে কী পরিমাণ লস খেয়েছি তা তো তুমি জানো। ছেলেটিকে নিয়ে নতুন ছবি বানাব সেই সামর্থ্য নেই। শুনেছি, তুমি নতুন ছবি করছ। যদি পারো ওকে একটু সুযোগ করে দাও। আমি কৃতজ্ঞ থাকবো তোমার কাছে’।

দারাশিকোকে প্রচন্ড সম্মান করতেন নজরুল। সানীকে বাসায় যেতে বললেন। সময়ের আগে সানী হাজির। বাসায় ঢুকেই ভয় পেয়ে গেলেন। এ টি এম শামসুজ্জামান, রাজীব ও মিজু আহমেদের মতো অভিনেতারা সেখানে বসা। সবার সঙ্গে সানীকে পরিচয় করিয়ে দিলেন নজরুল। তাদের সামনে কয়েকটি দৃশ্য অভিনয় করতে বললেন। অভিনয় দেখে উপস্থিত সবাই প্রশংসা করলেন। কিন্তু শরীর নিয়ে ঝামেলায় পড়লো। সানী তখন বেশ মোটা। গল্পের নায়ক চিকন। সানী ১৫ দিন সময় নিলেন। এক কেজি কমিয়ে দেখা করতেন পরিচালকের সঙ্গে। এভাবে ১০ কেজি মাত্র কয়েকদিনে কমিয়ে ফেললেন। সানীকে দেখে সবাই প্রশংসা করলেন।

শুটিংয়ে পরিচালকের ছিল বাড়তি চ্যালেঞ্জ। প্রতিষ্ঠিত জুটিকে বাধ দিয়ে নতুন কাউকে নেয়া! ১৯৯৩ সালে মুক্তি পেল ‘চাঁদের আলো’ প্রথম সপ্তাহেই সুপারহিট। ছবির গান ভীষণ জনপ্রিয়তা পেল। আর সানীরও ভাগ্য বদলে গেল, হয়ে গেলেন তারকা।